টেস্টে দেশের সর্বোচ্চ ইনিংস: তাওহিদের রেকর্ড ও বিশ্বসেরাদের তালিকা
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তাওহিদ হৃদয়।
মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে তিনি অপরাজিত ২৪২ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস উপহার দিয়েছেন। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকের সেই কীর্তিকে ছাপিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই মাইলফলক স্পর্শ করলেন তাওহিদ। এই রেকর্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, টেস্ট ক্রিকেটে অন্যান্য দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের নজিরগুলো কেমন? তবে সেই রেকর্ড আবার লারাই নিজের করে নেন তার ঠিক ৬ মাস পরে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটির মালিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারা। ২০০৪ সালে অ্যান্টিগায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি অপরাজিত ৪০০ রানের অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলেছিলেন, যা প্রায় ২২ বছর ধরে অম্লান। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথিউ হেইডেন ২০০৩ সালের অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৮০ রানের ইনিংস খেলে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন, যা লারার কাছে হাতবদল হওয়ার আগ পর্যন্ত শীর্ষে ছিল। প্রায় ২২ বছর হয়ে গেলেও সেই রেকর্ড ভাঙতে পারেননি কেউই। টপকে যান ১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারার করা ৩৭৫ রানের রেকর্ড। শেষমেশ তিনি আন্দ্রে নেলের শিকার হয়ে আউট হন বিশ্বরেকর্ড থেকে ২৬ রানের দূরত্বে থেকে। তবে তার ৫ বছর পর নিজেরই রেকর্ডটাকে নতুন করে লিখেন তিনি। কিন্তু তিনি যে মেজাজে এই ইনিংস খেলেছিলেন, তা সবার ভাবনাকে ওলটপালট করে দিতে বাধ্য।
শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৭৪ রান করেছিলেন। ওই ম্যাচে কুমার সাঙ্গাকারার সঙ্গে তার ৬৩৮ রানের জুটি ছিল টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপ। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার উইয়ান মুল্ডার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৬৭ রানে অপরাজিত থাকার সময় ইনিংস ঘোষণা করে আলোচনার জন্ম দেন। লারার ৪০০ রানের রেকর্ডের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি ওই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান। ১৪ রানে ২ উইকেট হারানোর পর ব্যাট করতে এসে তিনি জুটি গড়েছিলেন কুমার সাঙ্গাকারার সঙ্গে, তাদের এই জুটি শেষমেশ ভেঙেছে ৬৩৮ রানে। ২০২৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ছিলেন তিনি নিজে।
ইংল্যান্ডের লেন হটন ১৯৩৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৬৪ রান করেছিলেন, যা ৮৮ বছর ধরে তাদের দেশের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে। পাকিস্তানের হানিফ মোহাম্মদের ৩৩৭ রানের রেকর্ডটিও বেশ পুরনো; ১৯৫৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯৭০ মিনিট ক্রিজে থেকে তিনি এই ইনিংসটি খেলেছিলেন, যা টেস্ট ইতিহাসের দীর্ঘতম ইনিংস। পরবর্তীতে ইনজামাম উল হক ৩২৯ এবং ইউনিস খান ৩১৩ রান করে এই তালিকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইংল্যান্ড: লেন হটন, ৩৬৪ এই তালিকার সবচেয়ে পুরোনো অন্তর্ভুক্তি এটি। পাকিস্তান: হানিফ মোহাম্মদ, ৩৩৭ লেন হটনের মতো না হলেও হানিফ মোহাম্মদের ৩৩৭ রানের রেকর্ডটির বয়স কম নয়। তারা হলেন– ইনজামাম উল হক, ২০০২ সালে ৩২৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, অন্যজন ইউনিস খান, ২০০৯ সালে পাকিস্তান ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দেওয়া শ্রীলঙ্কার টিম বাসে গোলাগুলির ঘটনার আগের মাসে এই লঙ্কানদের বিপক্ষে খেলেছিলেন ৩১৩ রানের ইনিংস। তবে বিশ্ব ক্রিকেটেও এর বাড়তি মাহাত্ম্য আছে। ৯৭০ মিনিটের এই ইনিংসের চেয়ে লম্বা আর একটি ইনিংসও দেখেনি ক্রিকেট। তার ওপর ম্যাচের তৃতীয় ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস হিসেবে প্রায় ৬৮ বছর ধরে টিকে আছে এই রেকর্ড।
ভারতের বীরেন্দর শেবাগ ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩১৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন, যা তার নিজের করা আগের ৩০০ রানের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের হয়ে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ৫৫৯ বল মোকাবেলা করে ৩০২ রানের ইনিংস খেলেন, যা কিউইদের একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরি হিসেবে অমর হয়ে আছে। এরপর থেকে গ্রাহাম গুচ, অ্যান্ডি স্যান্ডহাম, জন এডরিচ থেকে শুরু করে হালের হ্যারি ব্রুকরা ট্রিপল সেঞ্চুরি করে এই রেকর্ডকে হুমকির মুখে ফেলেছেন, তবে ভাঙতে পারেননি। এরপর থেকে শুধু ২ জন ট্রিপল সেঞ্চুরি করে চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছেন এই ইনিংসকে। ২৯৭ বলে ট্রিপল সেঞ্চুরি করে দ্রুততম ত্রিশতকের বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। নিউজিল্যান্ড: ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, ৩০২ টেস্টে সবচেয়ে বড় রানের রেকর্ডে কে করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আক্রমণাত্মক কারো ওপর বাজি ধরাই শ্রেয়। নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটাও ম্যাককালামই একদিন খেলবেন, এমন ভাবনাও হয়তো কোনো নিউজিল্যান্ড ভক্তের মনে ছিল।
জিম্বাবুয়ের ডেভ হটন ১৯৯৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৬৬ রান করেছিলেন, যা ৩২ বছর ধরে তাদের দেশের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। আফগানিস্তানের বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শাহিদি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৪৬ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস খেলেছেন। ওই একই ম্যাচে রহমত শাহ ২৩৪ রান করেছিলেন, যা আফগান ক্রিকেটে শাহিদির পরের সেরা সংগ্রহ।
সবশেষে আয়ারল্যান্ডের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। টেস্টে এখন পর্যন্ত কোনো আইরিশ ব্যাটার ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পাননি। তাদের অভিষেক টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে কেভিন ও ব্রায়েনের ১১৮ রানই বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ।
























