ঢাকায় সাফ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের আড়ালে বিশাল আর্থিক বাণিজ্যের হিসাব
আগামী ৫ থেকে ১৭ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে সাফের নতুন আসর বসছে। অতীতে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের সার্বিক দায়িত্বে বাফুফে থাকলেও এবার সেই ভূমিকায় রয়েছে সাফের বাণিজ্যিক স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান টিএসএ। বাফুফের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে তারা সরাসরি যুক্ত নয় এবং টিকিট থেকে শুরু করে স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার ব্যবস্থাপনার পুরোটাই দেখভাল করছে সাফ এবং তাদের বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো ব্যবহার করে কোটি টাকার এই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রকৃত হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই তুলনায় এবার মূল্য বেড়েছে বহুগুণ।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্ধারিত হারেই ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য মাঠ বরাদ্দ পেয়েছে টিএসএ। জাতীয় স্টেডিয়ামের মাঠের দৈনিক ভাড়া মাত্র ৬০ হাজার টাকা হওয়ায় নয় লাখ টাকা পাবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো মাঠে গড়াবে ৫, ৮, ১১, ১৪ ও ১৭ নভেম্বর। নির্ধারিত এই ভাড়ার বাইরে ফ্লাডলাইট ব্যবহার বাবদ প্রতি ঘণ্টায় ১০ হাজার টাকা এবং ডিজিটাল বোর্ড ও ডিসপ্লেসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধার জন্য আয়োজকদের আলাদা অর্থ পরিশোধ করতে হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) জাহেদ পারভেজ চৌধুরী জানান, প্রচলিত ভাড়ার হারেই মাঠ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই ভাড়া পর্যালোচনা করা হবে। এতে মাঠ ভাড়া বাবদ পরিষদ পাবে ৯ লাখ টাকা।
মা মাঠের ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও গেটমানির লভ্যাংশ নিয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অতীতের টুর্নামেন্টগুলোতে গেটমানির ১৫ শতাংশ এবং প্রচারস্বত্বের ১০ শতাংশ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এবারও টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়া শুরুর পর সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য অংশ নিয়ে আলোচনা চলছে। টিকিট বিক্রি মাত্র শুরু হওয়ায় সেখান থেকে পরিষদের আয়ের অংশ কত হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে বলে জানান জাহেদ পারভেজ চৌধুরী। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির আগেই কেন এই ভাগ চূড়ান্ত করা হলো না এবং ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হলে এর দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাফুফের ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সাফ ও বাফুফের সমঝোতার অংশ হিসেবে বাফুফে ৫০ লাখ টাকা পাবে বলে জানা গেছে। আয়োজনের দায়িত্বে না থাকার দাবি করা হলেও আর্থিক প্রাপ্তির এই বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এই অর্থ কোন খাতের এবং এর বিনিময়ে বাফুফের নির্দিষ্ট দায়িত্ব কী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে স্পন্সরশিপের বাজারেও বড় অঙ্কের বাণিজ্যের তথ্য মিলছে। টেকনো শিরোপা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস, হুঙ্কার, এসওএস ও টিকিফাইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা এসেছে। উদ্বোধনী ও সমাপনী কনসার্ট ঘিরেও রয়েছে নানা বাণিজ্যিক আয়োজন। তবে কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকার চুক্তি করেছে এবং পৃষ্ঠপোষকতার অর্জিত অর্থের কত অংশ সাফ ও টিএসএর হিসাবে যাচ্ছে, তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রচারস্বত্বের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্পষ্টতা বজায় রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য টি-স্পোর্টস এবং পাকিস্তানের জন্য মাইকোর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ডিজিটাল সম্প্রচারের দায়িত্ব পেয়েছে টফি এবং ভারত ও পাকিস্তান বাদে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারের ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব রয়েছে বঙ্গের হাতে। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হলেও সম্প্রচার থেকে মোট কত আয় হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি। আয়োজনের সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ এসে পড়ছে দর্শকদের ওপর। টুর্নামেন্টের সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম এক হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফের সাধারণ গ্যালারির টিকিট ছিল মাত্র ৫০ টাকার মধ্যে। আকাশচুম্বী এই দাম বৃদ্ধির পেছনে বিমানভাড়া, দল ও রেফারিদের যাতায়াত, স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনা এবং ভিএআরের খরচ বাড়ার যুক্তি দিচ্ছেন আয়োজকরা। তবে এর কোনো নির্দিষ্ট বাজেট বা টিকিট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা জনসমক্ষে আনা হয়নি। কত টিকিট বিক্রির লক্ষ্য, সম্ভাব্য গেটমানি কত এবং টিকিটের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হবে তার হিসেব নেই।
স্টেডিয়ামের স্কাইলাউঞ্জ ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিকদের ব্যবহারের জন্য জায়গাটি বরাদ্দ দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক নিজে স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জন্য জায়গাটি সংরক্ষণের নির্দেশ দিলেও টিএসএ সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছে স্কাইলাউঞ্জ চেয়েছে। বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমও একই বিষয়ে সাংবাদিকদের অনুরোধ জানিয়েছেন। বাফুফে যদি আয়োজক না-ই হয়, তবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাঁর এমন তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে এই আয়োজনের শীর্ষে থাকা সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের অতীত অধ্যায়ও বিতর্কমুক্ত নয়। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাফুফের সভাপতি থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বাফুফের আর্থিক নথি তলব করে এবং ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ১৭ কোটি টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২০২৩ সালে হাইকোর্ট দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। এছাড়া ফিফার তদন্তেও আর্থিক অনিয়মের দায়ে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ নিষিদ্ধ হন, যা তৎকালীন প্রশাসনের আর্থিক জবাবদিহির প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এসব ঘটনা সালাউদ্দিনের ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণ করে। তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্বের সময়কার প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
























