সৌদি-পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন তুরস্কের পার্লামেন্টে
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করেছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। এই চুক্তির ফলে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি তুরস্ক এখন নতুন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশীদার হলো। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো সদস্যদেশ সামরিক হামলার শিকার হলে অন্য সদস্যদেশগুলো আক্রান্ত দেশকে সহায়তায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তুরস্কের পার্লামেন্টে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৩৯৮ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে ২৭৯ জন চুক্তির পক্ষে এবং ১১৯ জন বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন। গত আগস্ট মাসে তুরস্ক প্রাথমিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং গত মাসে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়। পার্লামেন্টের ৫৯২ সদস্যের মধ্যে ভোট দেন ৩৯৮ জন। ইতোমধ্যে সিরিয়া চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চুক্তির মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য
রয়টার্সের হাতে আসা পার্লামেন্টের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই চুক্তিতে মোট ১৬টি অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রথম অনুচ্ছেদে সদস্যদেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশ অন্য কোনো দেশ বা সামরিক জোটের সশস্ত্র হামলা কিংবা আগ্রাসনের শিকার হলে অন্য সদস্যরা পারস্পরিক সহায়তার সব উপায় কাজে লাগিয়ে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা প্রদান করবে। এই বিধানটি নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ন্যাটোর ওই নীতি অনুযায়ী, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা এই মক্কা চুক্তিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা কৌশল ও আঞ্চলিক প্রভাব
- চুক্তির অন্যান্য ধারায় প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং রসদ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
- সম্ভাব্য সামরিক হুমকি মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোই এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
- প্রাথমিকভাবে ১০ বছর মেয়াদী এই চুক্তিতে সদস্যদেশগুলোর জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পথ রাখা হয়েছে।
- নতুন কোনো দেশ এতে যোগ দিতে চাইলে বর্তমান সদস্যদেশগুলোর সম্মতির প্রয়োজন হবে। সিরিয়া ইতোমধ্যেই এ ধরনের আগ্রহের কথা জানিয়েছে।
তবে তুরস্কের একই সঙ্গে ন্যাটো এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হওয়ায় সামরিক সম্পদ ব্যবহারে স্বার্থের সংঘাত হতে পারে কি না, তা নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তুরস্কের কর্মকর্তারা এ ধরনের উদ্বেগকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছেন। এদিকে, চুক্তি অনুমোদিত হলেও সৌদি আরবে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য আরও আইনি ও কৌশলগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের জানিয়েছেন, চুক্তি অনুমোদনের পর সৌদি আরবকে সহায়তার নির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ করা হবে। তিনি হুতিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়টি নাকচ করে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর আলোকপাত করেছেন।
সংঘাতময় ভূ-রাজনীতি ও প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল থেকে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘাত চলছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবে হামলা বাড়িয়েছে হুতিরা। এর মধ্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও কয়েক দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বৃহস্পতিবার সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা মদিনা অঞ্চলে একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর আগে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ উঠলেও হুতিরা তা অস্বীকার করে আসছে। এই জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে তুরস্কের এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এক নতুন মাত্রা যোগ করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।





















