5:51 pm, Saturday, 31 October 2026

উখিয়ায় নলকূপের গ্যাসে চার দিন ধরে অগ্নিকাণ্ড, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে একটি বসতবাড়িতে নলকূপ খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের যে আগুন লেগেছিল, তা টানা চার দিন ধরে জ্বলছে। গত ২৭ অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় নলকূপ স্থাপনের সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ পৌঁছানোর পর হঠাৎ করেই গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাতে আগুন ধরে যায়। এই অগ্নিকাণ্ড অব্যাহত থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গ্যাসের নির্গমন বন্ধ না হওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার জানিয়েছেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে সেখানে আগুন জ্বালানো, ধূমপান কিংবা লাইটার ব্যবহারের মতো যেকোনো ধরনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে—এমন সব কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এলাকায় মাইকিং, লাল পতাকা এবং কাঁটাতারের বেড়া বসিয়ে নজরদারি চালানো হলেও উৎসুক জনতার ভিড় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রশাসন জানিয়েছে, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। কারণ, যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সাথে অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকদের এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। এছাড়া আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তরেও গ্যাস জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আগুনের শিখার ধরণ দেখে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নির্গত গ্যাস থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে; এমনকি এতে তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষ গ্যাসের প্রকৃত উৎস ও পরিমাণ নিশ্চিত হতে ১৫ দিন এলাকাটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মো. শোয়েব বলেন, এই ১৫ দিন আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি শিখার উচ্চতা বৃদ্ধি পায় বা একই থাকে, তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ‘রিলফ কূপ’ খননের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হবে। তবে পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ নিজে থেকেই কমে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।

বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির জানান, বাপেক্সের সক্ষমতা রয়েছে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করার। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ধীরস্থিরভাবে এগোতে হচ্ছে। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

এদিকে, ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে বাপেক্স ওই এলাকায় ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ভূকম্পন জরিপ চালাবে।

জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে যদি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়, তবে সেখানে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত শুক্রবার বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়েও এ বিষয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে এলাকাটিকে বিভিন্ন নিরাপত্তা জোনে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চপর্যায়ের একটি দল।

Please Share This Post in Your Social Media

Update Time : 01:54:55 am, Saturday, 31 October 2026

উখিয়ায় নলকূপের গ্যাসে চার দিন ধরে অগ্নিকাণ্ড, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ

Update Time : 01:54:55 am, Saturday, 31 October 2026

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে একটি বসতবাড়িতে নলকূপ খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের যে আগুন লেগেছিল, তা টানা চার দিন ধরে জ্বলছে। গত ২৭ অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় নলকূপ স্থাপনের সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ পৌঁছানোর পর হঠাৎ করেই গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাতে আগুন ধরে যায়। এই অগ্নিকাণ্ড অব্যাহত থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গ্যাসের নির্গমন বন্ধ না হওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার জানিয়েছেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে সেখানে আগুন জ্বালানো, ধূমপান কিংবা লাইটার ব্যবহারের মতো যেকোনো ধরনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে—এমন সব কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এলাকায় মাইকিং, লাল পতাকা এবং কাঁটাতারের বেড়া বসিয়ে নজরদারি চালানো হলেও উৎসুক জনতার ভিড় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রশাসন জানিয়েছে, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। কারণ, যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সাথে অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকদের এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। এছাড়া আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তরেও গ্যাস জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আগুনের শিখার ধরণ দেখে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নির্গত গ্যাস থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে; এমনকি এতে তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষ গ্যাসের প্রকৃত উৎস ও পরিমাণ নিশ্চিত হতে ১৫ দিন এলাকাটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মো. শোয়েব বলেন, এই ১৫ দিন আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি শিখার উচ্চতা বৃদ্ধি পায় বা একই থাকে, তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ‘রিলফ কূপ’ খননের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হবে। তবে পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ নিজে থেকেই কমে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।

বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির জানান, বাপেক্সের সক্ষমতা রয়েছে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করার। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ধীরস্থিরভাবে এগোতে হচ্ছে। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

এদিকে, ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে বাপেক্স ওই এলাকায় ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ভূকম্পন জরিপ চালাবে।

জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে যদি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়, তবে সেখানে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত শুক্রবার বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়েও এ বিষয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে এলাকাটিকে বিভিন্ন নিরাপত্তা জোনে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চপর্যায়ের একটি দল।