পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ, বাড়ছে ধর্মান্তরের চাপ
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর একের পর এক হামলার অভিযোগ সামনে আসছে। সর্বশেষ পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় এক খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (বিএইচপি) বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সংগঠনের সদস্য পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি তাদের সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিয়েছে এবং জোর করে ধর্মান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছে। পাঁশকুড়ার বাসিন্দা সোরেনের দাবি, এই ‘দুষ্কৃতকারীরা’ এর আগেও তাদের পরিবারকে হুমকি দিয়েছিল। আমরা ওদের বলেছি, আমরা নিজে থেকে খ্রিস্টান ধর্ম বেছে নিয়েছি, আমরা পালন করছি। তারা আমাদের বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগ কেটে দেওয়ার, রেশন এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিয়েছে। আমাদের কেউ যাতে সাহায্য না করে, তার জন্য সবাইকে হুমকি দিচ্ছে তারা।’।
আক্রান্ত পার্বতী হেমব্রম সোরেন জানিয়েছেন, গত সোমবার রাতে যখন তার পরিবার বাড়িতে প্রার্থনা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মদ্যপ অবস্থায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ জোর করে তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। সোরেন অভিযোগ করেন, আক্রমণকারীরা তাকে চুলের মুঠি ধরে মারধর করেছে, তার স্বামীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে এবং আত্মীয়দের গায়েও হাত তুলেছে। অতীতেও এই ব্যক্তিরা তাদের খ্রিষ্টধর্ম পালনের কারণে হুমকি দিয়েছিল বলে তিনি জানান। সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় তাদের বাড়িতে জোর করে ঢুকে পড়ে এবং হামলা করে। বলেছে আমাদের বাড়িতে থাকতে দেবে না। আমার স্বামীকে অকত্থ্য ভাষায় গালাগাল করছিল। আমাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়রাও ছিলেন, আমার ননদের গায়েও হাত তুলেছিল তারা। তিনি বলেন, ‘গতকাল রাতে ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে তারা মদ্যপান করে চোরের মতো আমাদের বাড়ি আসেন। সেই ফোনালাপ চলাকালীনই আক্রমণকারীরা তার ফোন কেড়ে নেন। এখন তারা লোকজনকে আমাদের কাজ দিতে বারণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরাধনার স্থানটি পুড়িয়ে ফেলা হয়, ছিঁড়ে ফেলা হয়, আমাদের টেনে বের করে মারধর করা হয়। আমার উপর হামলা করেছে, সঙ্গে আমার ননদকেও চড়-থাপ্পড় মেরেছে। বলেছে, এ বার ৫০ থেকে ১০০ জনকে নিয়ে আসবে।
ভুক্তভোগী নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর একই ব্যক্তিরা তাদের বাড়িতে এসে হুমকি দিয়েছিল।
সোমবার রাতের ঘটনার সময়ে তারা অন্ধকারে এসে এই তাণ্ডব চালায়। এমন সময়ে এসেছে অন্ধকারে যে বাইরের লোক যে ভিডিও করবে সেটাও সম্ভব ছিল না। আমার মোবাইলে আমি ভিডিও করেছিলাম, সেটাও তারা আমার ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ডিলিট করে দিয়েছেন।
সোরেন জানান, আক্রমণকারীরা উঠোনে জোর করে তুলসি মঞ্চ ও মনসা মন্দির তৈরির চাপ সৃষ্টি করছিল।
খ্রিস্টধর্মকে ‘আমেরিকান ধর্ম’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের হিন্দুধর্ম গ্রহণের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে বুঝতে পেরে ফোনের সংযোগও কেটে দেন।
নিরাপত্তার অভাবে বর্তমানে সোরেন ও তার পরিবার এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সোরেনের স্বামী টোটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং লোন নিয়ে টোটো কেনায় বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এর আগে দুর্গাপূজার সময় পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনাতেও বজরং দলের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। সেখানে এক নারীকে হেনস্তার পাশাপাশি ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মান্তরের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার ভুক্তভোগী নারী বর্তমানে চিকিৎসাধীন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর একদল ব্যক্তি তার বাড়িতে ঢুকে মারধর করে এবং তার সম্মতি ছাড়াই তাকে সবার সামনে স্নান করিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানে বাধ্য করে। এমনকি, গত ২০ অক্টোবর তাকে ও তার স্বামীসহ চারজনকে একটি পুজামণ্ডপে নিয়ে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া তার তিনজন আত্মীয়ও সেখানে ছিলেন।
এদিকে, ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ নামে একটি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের ওপর ৬০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গীয় খ্রিষ্টিয় পরিষেবা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিকের দাবি, পরিস্থিতি জানতে তাদের এক আইনজীবী যোগাযোগ করলে আক্রমণকারীরা তার ফোন কেড়ে নেয় এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য পরিচয় দিয়ে আইনজীবীকেও হুমকি দেয়। চলতি বছরের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর একাধিক হামলার অভিযোগ উঠেছে। ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ নামে একটি গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের ওপর মোট ৬০টি।
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ রয়েছে। পাঁশকুড়া থানার পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ পেলেও এখনও এফআইআর দায়ের করা হয়নি, তদন্ত চলছে। চন্দ্রকোনার ঘটনায় গত ২০ অক্টোবর এফআইআর দায়ের হলেও অভিযুক্ত ১৩ জনের কাউকেই এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশের দাবি, বয়ান বা নথিপত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা অভিযোগ দায়ের করলেও পুলিশ এখনও কোনো মামলা শুরু করেনি।’।
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা চন্দ্রনাথ দাস জানান, তাদের লক্ষ্য কেবল ধর্মান্তর রোধ নয়, বরং বিধর্মীদের হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনা। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে প্রতিটি গ্রামে এই অভিযান চালানো হচ্ছে এবং তাদের সংগঠন প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে হিন্দু করছে।
রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল চন্দ্রকোনার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার দাবি করেছেন, তাদের দল যেকোনো ধরনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছে এবং ভুক্তভোগীদের আইনি পথে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।























