1:56 pm, Thursday, 29 October 2026

চীনের সমালোচনায় জড়িয়ে কেন ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে ও জন সিনা

বিশ্বজুড়ে তারকা ক্রীড়াবিদদের অনেকেই নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সাহসী মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। তবে এই সাহসিকতা যেন চীনের ক্ষেত্রে অনেকটা সীমাবদ্ধ। বিশাল বাণিজ্যিক বাজার ও অর্থনৈতিক লাভের কথা মাথায় রেখে, চীনের বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই নীরব থাকেন কিংবা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। ফরাসি ফুটবল সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই বাস্তবতারই সর্বশেষ সংযোজন।

সম্প্রতি এমবাপ্পেকে নিয়ে ইন্টারনেটে একটি মিম ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবির ওপর এই ফুটবলারের মুখ বসানো হয়েছিল।

এক সাক্ষাৎকারে সেই মিম নিয়ে আলোচনার সময় মাও সেতুংকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে মন্তব্য করেন এমবাপ্পে।

এই মন্তব্যের জেরে চীনা কোম্পানিগুলো তার সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করে।

এমনকি চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্প্যানিশ লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করলে, বাধ্য হয়ে লিগ কর্তৃপক্ষ ও এমবাপ্পে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এমবাপ্পে জানান, তার মন্তব্যটি অবিবেচকের মতো ছিল এবং এটি চীনা সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। আমি এখন বুঝতে পারছি যে এটি চীন এবং বিশ্বজুড়ে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের বহু মানুষের মনে আঘাত দিয়েছে। আমার কথায় যারা কষ্ট পেয়েছেন, আমি সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। চীনা জনগণ এবং তাদের ইতিহাসের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং আমি এর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’। সেখানে খেলতে পেরে আমাদের ভালো লাগে।’।

এমবাপ্পেই প্রথম নন, চীনের বাজারে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এর আগেও অনেক তারকা ক্রীড়াবিদ একই পথে হেঁটেছেন। এনবিএ তারকা লেব্রন জেমস এর অন্যতম উদাহরণ। যদিও ২০১৮ সালে জেমস ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি শুধু বাস্কেটবল খেলোয়াড় নন এবং সামাজিক ইস্যুতে নীরব থাকবেন না, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তার এই অবস্থান দেখা যায়নি। ২০১৯ সালে হিউস্টন রকেটের জেনারেল ম্যানেজার ড্যারিল মোরি হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিলে, জেমস তাকে ‘অজ্ঞ’ বলে সমালোচনা করেন। ওই সময় জেমস হার্ডেনও চীনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে তারা চীনকে ভালোবাসেন। কিন্তু চীনের প্রসঙ্গ আসলেই তাদের সেই বিদ্রোহী বা সাহসী রূপের দেখা মেলে না বললেই চলে। আমেরিকার বাস্কেটবল সুপারস্টার লেব্রন জেমসের ক্ষেত্রে বিষয়টি সবচেয়ে পরিষ্কার।

ডব্লিউডব্লিউই সুপারস্টার জন সিনা ২০২১ সালে ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ৯’ সিনেমার প্রচারে গিয়ে তাইওয়ানকে ‘দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে তোপের মুখে পড়েন। পরবর্তীতে ম্যান্ডারিন ভাষায় ভিডিও বার্তা দিয়ে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। এছাড়া কাইরি আরভিং ও স্টিফেন কারির মতো তারকারাও পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনায় সোচ্চার থাকলেও চীনের ক্ষেত্রে সতর্ক ভূমিকা পালন করেন। গত বছর টেনিস তারকা টেলর টাউনসেন্ড শেনজেনে বিলি জিন কিং কাপের সময় খাবার নিয়ে মন্তব্য করে চীনা দর্শকদের রোষানলে পড়েন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, হংকংয়ের স্বাধীনতা বা তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কিংবা ইতিহাসের নিরিখে মাও সেতুংয়ের পরিচয় নিয়ে সত্য বলার জন্য একজন অ্যাথলেটের ক্ষমা চাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব তারকা চীনের লোভনীয় বাজার হারানোর ভয়ে নিজেদের নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন। যখন ব্যক্তিগত ঝুঁকি বা বাণিজ্যিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তখনই তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভয়ে নতি স্বীকার করেন, যা তাদের সুবিধাবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব ক্ষেত্রে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে এই তারকারা আদতে কতটা সুবিধাবাদী।

Please Share This Post in Your Social Media

Update Time : 06:22:52 am, Thursday, 29 October 2026

চীনের সমালোচনায় জড়িয়ে কেন ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে ও জন সিনা

Update Time : 06:22:52 am, Thursday, 29 October 2026

বিশ্বজুড়ে তারকা ক্রীড়াবিদদের অনেকেই নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সাহসী মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। তবে এই সাহসিকতা যেন চীনের ক্ষেত্রে অনেকটা সীমাবদ্ধ। বিশাল বাণিজ্যিক বাজার ও অর্থনৈতিক লাভের কথা মাথায় রেখে, চীনের বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই নীরব থাকেন কিংবা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। ফরাসি ফুটবল সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই বাস্তবতারই সর্বশেষ সংযোজন।

সম্প্রতি এমবাপ্পেকে নিয়ে ইন্টারনেটে একটি মিম ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবির ওপর এই ফুটবলারের মুখ বসানো হয়েছিল।

এক সাক্ষাৎকারে সেই মিম নিয়ে আলোচনার সময় মাও সেতুংকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে মন্তব্য করেন এমবাপ্পে।

এই মন্তব্যের জেরে চীনা কোম্পানিগুলো তার সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করে।

এমনকি চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্প্যানিশ লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করলে, বাধ্য হয়ে লিগ কর্তৃপক্ষ ও এমবাপ্পে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এমবাপ্পে জানান, তার মন্তব্যটি অবিবেচকের মতো ছিল এবং এটি চীনা সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। আমি এখন বুঝতে পারছি যে এটি চীন এবং বিশ্বজুড়ে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের বহু মানুষের মনে আঘাত দিয়েছে। আমার কথায় যারা কষ্ট পেয়েছেন, আমি সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। চীনা জনগণ এবং তাদের ইতিহাসের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং আমি এর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’। সেখানে খেলতে পেরে আমাদের ভালো লাগে।’।

এমবাপ্পেই প্রথম নন, চীনের বাজারে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এর আগেও অনেক তারকা ক্রীড়াবিদ একই পথে হেঁটেছেন। এনবিএ তারকা লেব্রন জেমস এর অন্যতম উদাহরণ। যদিও ২০১৮ সালে জেমস ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি শুধু বাস্কেটবল খেলোয়াড় নন এবং সামাজিক ইস্যুতে নীরব থাকবেন না, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তার এই অবস্থান দেখা যায়নি। ২০১৯ সালে হিউস্টন রকেটের জেনারেল ম্যানেজার ড্যারিল মোরি হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিলে, জেমস তাকে ‘অজ্ঞ’ বলে সমালোচনা করেন। ওই সময় জেমস হার্ডেনও চীনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে তারা চীনকে ভালোবাসেন। কিন্তু চীনের প্রসঙ্গ আসলেই তাদের সেই বিদ্রোহী বা সাহসী রূপের দেখা মেলে না বললেই চলে। আমেরিকার বাস্কেটবল সুপারস্টার লেব্রন জেমসের ক্ষেত্রে বিষয়টি সবচেয়ে পরিষ্কার।

ডব্লিউডব্লিউই সুপারস্টার জন সিনা ২০২১ সালে ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ৯’ সিনেমার প্রচারে গিয়ে তাইওয়ানকে ‘দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে তোপের মুখে পড়েন। পরবর্তীতে ম্যান্ডারিন ভাষায় ভিডিও বার্তা দিয়ে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। এছাড়া কাইরি আরভিং ও স্টিফেন কারির মতো তারকারাও পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনায় সোচ্চার থাকলেও চীনের ক্ষেত্রে সতর্ক ভূমিকা পালন করেন। গত বছর টেনিস তারকা টেলর টাউনসেন্ড শেনজেনে বিলি জিন কিং কাপের সময় খাবার নিয়ে মন্তব্য করে চীনা দর্শকদের রোষানলে পড়েন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, হংকংয়ের স্বাধীনতা বা তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কিংবা ইতিহাসের নিরিখে মাও সেতুংয়ের পরিচয় নিয়ে সত্য বলার জন্য একজন অ্যাথলেটের ক্ষমা চাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব তারকা চীনের লোভনীয় বাজার হারানোর ভয়ে নিজেদের নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন। যখন ব্যক্তিগত ঝুঁকি বা বাণিজ্যিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তখনই তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভয়ে নতি স্বীকার করেন, যা তাদের সুবিধাবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব ক্ষেত্রে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে এই তারকারা আদতে কতটা সুবিধাবাদী।