6:32 pm, Tuesday, 3 November 2026

লর্ডসে ফিক্সিংয়ের ১৫ বছর: তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের সাজা ও পতন

পাড়ার ক্রিকেটে বোলিং ক্রিজের ওপাশে পা চলে গেলে সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে ‘নো বল’। নো বল মানে বাড়তি একটি রান, সাথে একটি অতিরিক্ত বল। কখনো এই ভুলের কারণে ব্যাটসম্যান পেয়ে যান নতুন জীবন। সাধারণ ক্রিকেটে এটি কেবলই একটি নিয়ম ভাঙার ঘটনা কিংবা দর্শকের কাছে সামান্য বিরক্তির বিষয়। তবে ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চতুর্থ টেস্টে তিনটি নো বল ক্রিকেটের ইতিহাসে কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়েছিল। এই তিনটি নো বলের মূল্য শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল পাকিস্তানের তিন শীর্ষ ক্রিকেটারকে—অধিনায়ক সালমান বাট, গতি তারকা মোহাম্মদ আসিফ ও উদীয়মান পেসার মোহাম্মদ আমির। পাড়ার ক্রিকেটে ক্রিজ আঁকা হয় ইটের টুকরা বা সাদা চক দিয়ে। ওভারস্টেপ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিকেলের ঝগড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। বোলারের জন্য সেটি ভুল, আম্পায়ারের জন্য একটি সিদ্ধান্ত। কী ঘটেছিল সেদিন, কীভাবে ধরা পড়েছিলেন ক্রিকেটাররা, আর এত বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে সেই তিন জীবন। পা প্রায় আধা মিটার দূরে ছিল পপিং ক্রিজ থেকে। গতি, নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটে নতুন এক বিস্ময়ের নাম হয়ে উঠছিলেন আমির। কিন্তু ক্রিকেটের দরজা সবার জন্য আর আগের মতো খোলেনি।

সেই কলঙ্কিত ঘটনার আসামিদের সাজা ঘোষণা হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর। ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সেই স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির ১৫ বছর পূর্তিতে ঘটনাটি আবারও সামনে এসেছে। এই ঘটনার সূত্রপাত মাঠের ভেতর হয়নি, হয়েছিল লন্ডনের এক গোপন বৈঠকে। ২০১০ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সাংবাদিকেরা একটি স্টিং অপারেশনের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের প্রতিনিধি ও এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেন। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে। মাঠের দর্শকেরা তখনো জানতেন না, এই বলগুলোর পেছনে কত বড় চিত্রনাট্য। দুই দিন পর, ৩ নভেম্বর বিচারক জেরেমি কুক সাজা ঘোষণা করেন। জানতেন না, ক্রিকেটের সবচেয়ে পবিত্র বলে বিবেচিত লর্ডসের মাঠেই রচিত হচ্ছে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। হকি মাঠের অপূর্ণ স্বপ্ন আর ক্রিকেটের বিশ্বজয়ী সাম্রাজ্য: অন্য এক শাহরুখ খানের গল্প।

গোপন ক্যামেরা ও টাকার বান্ডিল

বৈঠকে সাংবাদিকদের সামনে মাজহার মাজিদ টাকার বান্ডিল গুনছিলেন। তিনি আগে থেকেই নিশ্চিত করে জানান, লর্ডস টেস্টে তরুণ বোলার মোহাম্মদ আমির ও অভিজ্ঞ মোহাম্মদ আসিফ কখন নো বল করবেন। বিনিময়ে জুয়াড়িরা বড় অঙ্কের বাজি ধরতে পারবে। পুরো ম্যাচের ফলাফল পরিবর্তন না করে নির্দিষ্ট মুহূর্তে নো বল করিয়ে দেওয়া ছিল এই ফিক্সিংয়ের মূল কৌশল।

২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডস টেস্ট চলাকালে মাজিদের বলে দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটি করতে এসে ক্রিজের অনেক বাইরে পা ফেলে স্পষ্ট নো বল করেন ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আমির। ধারাভাষ্যকারের চোখেও আমিরের পা এতটা সামনে চলে যাওয়া অস্বাভাবিক লেগেছিল। এরপর ম্যাচের দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে একই কাজ করেন মোহাম্মদ আসিফ।

তদন্ত ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া

দুটি বল, দুটি পূর্বাভাসের নিখুঁত বাস্তবায়ন দেখে তোলপাড় শুরু হয়। ট্যাবলয়েডটি গোপন ভিডিও প্রকাশ করার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তে নামে এবং গ্রেপ্তার করে মাজহার মাজিদকে। তদন্তের আওতায় আনা হয় সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমিরকে। পুলিশ তাঁদের ব্যবহৃত মুঠোফোন জব্দ করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তদন্তে অবশ্য ‘জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি’ খুঁজে পাওয়া গেল।

শুরুতে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল। পিসিবি-র তৎকালীন সভাপতি ইজাজ বাট দাবি করেন যে খেলোয়াড়েরা নির্দোষ। যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের হাইকমিশনার ওয়াজিদ শামসুল হাসানও ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন যে তাঁদের চক্রান্ত করে ‘ফাঁদে ফেলা’ হয়েছে।

তিন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপট

সে সময় ১৮ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার মোহাম্মদ আমিরকে নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে প্রবল আশা ছিল। ২০০৯ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য আমিরের গতি ও বল সুইং করানোর ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁকে দেখা হতো পাকিস্তানের পরবর্তী ক্রিকেট বিস্ময় হিসেবে।

অন্যদিকে মোহাম্মদ আসিফ ছিলেন অভিজ্ঞ এবং বল দুই দিকে সুইং করানোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সিদ্ধহস্ত। আর ওপেনার সালমান বাট তখন টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনজনই ছিলেন জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলকে দুই দিকে সুইং করানোর দক্ষতায় ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারতেন।

আইসিসি ও ব্রিটিশ আদালতের রায়

অভিযোগ পাওয়ার পর ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এই তিন ক্রিকেটারকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। তদন্ত ও শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইসিসির স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল সালমান বাটকে ১০ বছর, আসিফকে ৭ বছর এবং আমিরকে ৫ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

ক্রিকেট বোর্ডের শাস্তির পাশাপাশি ব্রিটিশ পুলিশের ফৌজদারি মামলা সচল থাকে। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্ট সালমান বাট ও মোহাম্মদ আসিফকে দুর্নীতি ও অর্থ গ্রহণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে। আমির ও মাজহার মাজিদ আদালতের কাছে আগেই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ৩ নভেম্বর আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। স্পোর্টস কোর্ট অব আরবিট্রেশনে তাঁর ও আসিফের আপিল আগেই খারিজ হয়ে গিয়েছিল।

শাস্তিভোগ ও পরবর্তী জীবন

অর্ধেক সাজা ভোগ করে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগার থেকে মুক্তি পান আমির। একই বছরের মে মাসে আসিফ ও জুন মাসে সালমান বাট মুক্ত হন। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাঠে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। ২০১৩ সালে লাহোরে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সালমান বাট প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। অন্যদিকে করাচি প্রেসক্লাবে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন আসিফ। বললেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করবেন।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আইসিসি আসিফ ও বাটকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার অনুমোদন দেয়। ২০১৬ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটে শতক হাঁকিয়ে বাট নজর কাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর ফেরা হয়নি। অন্যদিকে আমির ২০১৮-১৯ মৌসুমে জাতীয় দলে ফেরেন এবং ২০১৯ সালে টেস্ট থেকে অবসর নেন। ২০২৪ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অবসর ভেঙে আমির আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কয়েকটি ম্যাচ খেলেন। ক্রিকেট ছাড়ার পর সালমান বাট ধারাভাষ্যকার ও ইউটিউব বিশ্লেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। উল্টোদিকে মোহাম্মদ আসিফ খেলার জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যান। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরেই সেঞ্চুরি করলেন বাট। ২০১৬ সালে পাকিস্তান দলের সঙ্গে ইংল্যান্ড সফরের ভিসা পান আমির, যে দেশে জেল খেটেছিলেন, সেখানেই ফিরলেন।

অনুতাপ ও বৈশ্বিক ক্রিকেটে প্রভাব

আসিফ পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁর আগেও ক্রিকেটে ফিক্সিং হয়েছে এবং পরেও হয়েছে, কিন্তু পিসিবি শুধু তাঁদের সঙ্গেই কঠোর আচরণ করেছে। তবে লর্ডসের সেই ঘটনা ক্রিকেট বিশ্বে বড় পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করে। সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ বলেছিলেন, ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কিছু অস্পষ্টতা আছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংশয়ের জায়গা ছোট হয়ে আসে।

আইসিসি এই ঘটনার পর থেকে খেলোয়াড়দের দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা, সন্দেহজনক যোগাযোগ শনাক্ত করা এবং জুয়াড়িদের প্রস্তাবের তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করে। এত কড়াকড়ির পরও ২০১৮ সালে শারজিল খান ও ২০২০ সালে উমর আকমল পাকিস্তান সুপার লিগে ফিক্সিং ও নিয়মভঙ্গের দায়ে নিষিদ্ধ হন, যা ক্রিকেটে দুর্নীতির স্থায়ী চ্যালেঞ্জকে আবারও প্রমাণ করে।

Please Share This Post in Your Social Media

Update Time : 03:14:27 am, Tuesday, 3 November 2026

লর্ডসে ফিক্সিংয়ের ১৫ বছর: তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের সাজা ও পতন

Update Time : 03:14:27 am, Tuesday, 3 November 2026

পাড়ার ক্রিকেটে বোলিং ক্রিজের ওপাশে পা চলে গেলে সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে ‘নো বল’। নো বল মানে বাড়তি একটি রান, সাথে একটি অতিরিক্ত বল। কখনো এই ভুলের কারণে ব্যাটসম্যান পেয়ে যান নতুন জীবন। সাধারণ ক্রিকেটে এটি কেবলই একটি নিয়ম ভাঙার ঘটনা কিংবা দর্শকের কাছে সামান্য বিরক্তির বিষয়। তবে ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চতুর্থ টেস্টে তিনটি নো বল ক্রিকেটের ইতিহাসে কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়েছিল। এই তিনটি নো বলের মূল্য শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল পাকিস্তানের তিন শীর্ষ ক্রিকেটারকে—অধিনায়ক সালমান বাট, গতি তারকা মোহাম্মদ আসিফ ও উদীয়মান পেসার মোহাম্মদ আমির। পাড়ার ক্রিকেটে ক্রিজ আঁকা হয় ইটের টুকরা বা সাদা চক দিয়ে। ওভারস্টেপ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিকেলের ঝগড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। বোলারের জন্য সেটি ভুল, আম্পায়ারের জন্য একটি সিদ্ধান্ত। কী ঘটেছিল সেদিন, কীভাবে ধরা পড়েছিলেন ক্রিকেটাররা, আর এত বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে সেই তিন জীবন। পা প্রায় আধা মিটার দূরে ছিল পপিং ক্রিজ থেকে। গতি, নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটে নতুন এক বিস্ময়ের নাম হয়ে উঠছিলেন আমির। কিন্তু ক্রিকেটের দরজা সবার জন্য আর আগের মতো খোলেনি।

সেই কলঙ্কিত ঘটনার আসামিদের সাজা ঘোষণা হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর। ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সেই স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির ১৫ বছর পূর্তিতে ঘটনাটি আবারও সামনে এসেছে। এই ঘটনার সূত্রপাত মাঠের ভেতর হয়নি, হয়েছিল লন্ডনের এক গোপন বৈঠকে। ২০১০ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সাংবাদিকেরা একটি স্টিং অপারেশনের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের প্রতিনিধি ও এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেন। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে। মাঠের দর্শকেরা তখনো জানতেন না, এই বলগুলোর পেছনে কত বড় চিত্রনাট্য। দুই দিন পর, ৩ নভেম্বর বিচারক জেরেমি কুক সাজা ঘোষণা করেন। জানতেন না, ক্রিকেটের সবচেয়ে পবিত্র বলে বিবেচিত লর্ডসের মাঠেই রচিত হচ্ছে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। হকি মাঠের অপূর্ণ স্বপ্ন আর ক্রিকেটের বিশ্বজয়ী সাম্রাজ্য: অন্য এক শাহরুখ খানের গল্প।

গোপন ক্যামেরা ও টাকার বান্ডিল

বৈঠকে সাংবাদিকদের সামনে মাজহার মাজিদ টাকার বান্ডিল গুনছিলেন। তিনি আগে থেকেই নিশ্চিত করে জানান, লর্ডস টেস্টে তরুণ বোলার মোহাম্মদ আমির ও অভিজ্ঞ মোহাম্মদ আসিফ কখন নো বল করবেন। বিনিময়ে জুয়াড়িরা বড় অঙ্কের বাজি ধরতে পারবে। পুরো ম্যাচের ফলাফল পরিবর্তন না করে নির্দিষ্ট মুহূর্তে নো বল করিয়ে দেওয়া ছিল এই ফিক্সিংয়ের মূল কৌশল।

২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডস টেস্ট চলাকালে মাজিদের বলে দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটি করতে এসে ক্রিজের অনেক বাইরে পা ফেলে স্পষ্ট নো বল করেন ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আমির। ধারাভাষ্যকারের চোখেও আমিরের পা এতটা সামনে চলে যাওয়া অস্বাভাবিক লেগেছিল। এরপর ম্যাচের দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে একই কাজ করেন মোহাম্মদ আসিফ।

তদন্ত ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া

দুটি বল, দুটি পূর্বাভাসের নিখুঁত বাস্তবায়ন দেখে তোলপাড় শুরু হয়। ট্যাবলয়েডটি গোপন ভিডিও প্রকাশ করার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তে নামে এবং গ্রেপ্তার করে মাজহার মাজিদকে। তদন্তের আওতায় আনা হয় সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমিরকে। পুলিশ তাঁদের ব্যবহৃত মুঠোফোন জব্দ করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তদন্তে অবশ্য ‘জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি’ খুঁজে পাওয়া গেল।

শুরুতে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল। পিসিবি-র তৎকালীন সভাপতি ইজাজ বাট দাবি করেন যে খেলোয়াড়েরা নির্দোষ। যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের হাইকমিশনার ওয়াজিদ শামসুল হাসানও ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন যে তাঁদের চক্রান্ত করে ‘ফাঁদে ফেলা’ হয়েছে।

তিন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপট

সে সময় ১৮ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার মোহাম্মদ আমিরকে নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে প্রবল আশা ছিল। ২০০৯ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য আমিরের গতি ও বল সুইং করানোর ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁকে দেখা হতো পাকিস্তানের পরবর্তী ক্রিকেট বিস্ময় হিসেবে।

অন্যদিকে মোহাম্মদ আসিফ ছিলেন অভিজ্ঞ এবং বল দুই দিকে সুইং করানোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সিদ্ধহস্ত। আর ওপেনার সালমান বাট তখন টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনজনই ছিলেন জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলকে দুই দিকে সুইং করানোর দক্ষতায় ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারতেন।

আইসিসি ও ব্রিটিশ আদালতের রায়

অভিযোগ পাওয়ার পর ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এই তিন ক্রিকেটারকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। তদন্ত ও শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইসিসির স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল সালমান বাটকে ১০ বছর, আসিফকে ৭ বছর এবং আমিরকে ৫ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

ক্রিকেট বোর্ডের শাস্তির পাশাপাশি ব্রিটিশ পুলিশের ফৌজদারি মামলা সচল থাকে। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্ট সালমান বাট ও মোহাম্মদ আসিফকে দুর্নীতি ও অর্থ গ্রহণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে। আমির ও মাজহার মাজিদ আদালতের কাছে আগেই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ৩ নভেম্বর আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। স্পোর্টস কোর্ট অব আরবিট্রেশনে তাঁর ও আসিফের আপিল আগেই খারিজ হয়ে গিয়েছিল।

শাস্তিভোগ ও পরবর্তী জীবন

অর্ধেক সাজা ভোগ করে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগার থেকে মুক্তি পান আমির। একই বছরের মে মাসে আসিফ ও জুন মাসে সালমান বাট মুক্ত হন। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাঠে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। ২০১৩ সালে লাহোরে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সালমান বাট প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। অন্যদিকে করাচি প্রেসক্লাবে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন আসিফ। বললেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করবেন।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আইসিসি আসিফ ও বাটকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার অনুমোদন দেয়। ২০১৬ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটে শতক হাঁকিয়ে বাট নজর কাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর ফেরা হয়নি। অন্যদিকে আমির ২০১৮-১৯ মৌসুমে জাতীয় দলে ফেরেন এবং ২০১৯ সালে টেস্ট থেকে অবসর নেন। ২০২৪ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অবসর ভেঙে আমির আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কয়েকটি ম্যাচ খেলেন। ক্রিকেট ছাড়ার পর সালমান বাট ধারাভাষ্যকার ও ইউটিউব বিশ্লেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। উল্টোদিকে মোহাম্মদ আসিফ খেলার জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যান। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরেই সেঞ্চুরি করলেন বাট। ২০১৬ সালে পাকিস্তান দলের সঙ্গে ইংল্যান্ড সফরের ভিসা পান আমির, যে দেশে জেল খেটেছিলেন, সেখানেই ফিরলেন।

অনুতাপ ও বৈশ্বিক ক্রিকেটে প্রভাব

আসিফ পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁর আগেও ক্রিকেটে ফিক্সিং হয়েছে এবং পরেও হয়েছে, কিন্তু পিসিবি শুধু তাঁদের সঙ্গেই কঠোর আচরণ করেছে। তবে লর্ডসের সেই ঘটনা ক্রিকেট বিশ্বে বড় পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করে। সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ বলেছিলেন, ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কিছু অস্পষ্টতা আছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংশয়ের জায়গা ছোট হয়ে আসে।

আইসিসি এই ঘটনার পর থেকে খেলোয়াড়দের দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা, সন্দেহজনক যোগাযোগ শনাক্ত করা এবং জুয়াড়িদের প্রস্তাবের তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করে। এত কড়াকড়ির পরও ২০১৮ সালে শারজিল খান ও ২০২০ সালে উমর আকমল পাকিস্তান সুপার লিগে ফিক্সিং ও নিয়মভঙ্গের দায়ে নিষিদ্ধ হন, যা ক্রিকেটে দুর্নীতির স্থায়ী চ্যালেঞ্জকে আবারও প্রমাণ করে।