শিয়ানের প্রাচীন মসজিদ ও চীনে ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস
চীনের শানসি প্রদেশের রাজধানী শিয়ান প্রাচীনকালে ছাংআন নামে পরিচিত ছিল। সিল্ক রোড বা প্রাচীন রেশমপথের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এই নগরীর সঙ্গে আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় যোগাযোগের ইতিহাস বহু শতাব্দীর পুরোনো। এই অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে শিয়ানের বিখ্যাত গ্রেট মসজিদ বা হুয়াজুয়ে লেন মসজিদটি অন্যতম। ১৩ শতাব্দীর ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন শিয়ানের বিখ্যাত গ্রেট মসজিদ বা হুয়াজুয়ে লেন মসজিদ। মসজিদটির চীনা নাম হুয়াজুয়ে শিয়াং ছিংজেন দাসি। শিয়ানের প্রায় ১৩ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা, নৈতিক আচরণ, সামাজিক আস্থা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবনাচার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।
৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে তাং রাজবংশের শাসনামলে এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠা হয়। ২০২৬ সাল হিসেবে এর প্রতিষ্ঠাকালের বয়স প্রায় ১ হাজার ২৮৪ বছর। তবে মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক লরেন্স ই. বাটলার তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, মসজিদটির প্রতিষ্ঠা ৭৪২ সালে বলে প্রচলিত ঐতিহ্য থাকলেও এত প্রাচীনকালের তথ্য নিখুঁতভাবে যাচাই করা বেশ কঠিন। ১৯৫৬ সাল থেকে এই স্থাপনাটিকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক গবেষণায় এ বর্ণনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে গবেষণাগত সতর্কতা রয়েছে।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। স্থাপত্যের দিক থেকে মসজিদটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
মধ্যপ্রাচ্যের মসজিদগুলোতে সাধারণত বড় গম্বুজ, উঁচু মিনার ও খিলান দেখা গেলেও শিয়ানের এই মসজিদে সেই প্রচলিত রূপ নেই।
বরং এটি চীনা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, উদ্যান ও ধর্মীয় প্রয়োজনের অপূর্ব সমন্বয়ে নির্মিত। একাধিক প্রাঙ্গণ, বাগান, অলংকৃত প্রবেশপথ এবং চীনা প্যাগোডার আদলে তৈরি মিনার এই মসজিদটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। মক্কার কিবলামুখী এই স্থাপনার ভেতর কাঠের নির্মাণকৌশল ও আরবি ক্যালিগ্রাফির চমৎকার মেলবন্ধন রয়েছে। এর নামাজের স্থান পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ মক্কার কিবলামুখী করে নির্মিত। স্থাপনার বিভিন্ন অংশে আরবি ক্যালিগ্রাফি, কোরআনের আয়াত ও ফুলেল নকশার ব্যবহার রয়েছে। কোথাও পারস্যের গম্বুজ ও মিনার, কোথাও তুর্কি স্থাপত্য, কোথাও ভারতীয় মুঘল শিল্পরীতি, আবার কোথাও চীনা প্রাসাদ ও উদ্যানের নির্মাণশৈলী ইসলামি স্থাপত্যে প্রভাব ফেলেছে।
চীনে ইসলামের প্রাচীন উপস্থিতি এবং মুসলিম বণিকদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। এটি দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
দক্ষিণ কোরিয়ার হানইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হি-সু লি তার ২০০২ সালের গবেষণাপত্রে প্রাচীন রাজকীয় নথির বরাত দিয়ে জানান, ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে আরবের শাসক চীনা দরবারে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার হানইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হি-সু লি ২০০২ সালে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্র ‘দ্য স্প্রেড অব ইসলামিক কালচার টু ইস্ট এশিয়া বিফোর দ্য এরা অব মডার্ন ইউরোপিয়ান হেজিমনি’-তে চীনের প্রাচীন রাজকীয় নথির বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন, ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে আরবের শাসক।
এই বছরটি তাই চীনের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের যোগাযোগের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে ঠিক ওই বছরই চীনে প্রথম স্থায়ী মুসলিম বসতি গড়ে উঠেছিল কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইসলামি ইতিহাস গবেষক জেমস ডি ফ্রাঙ্কেল এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থে বলা হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর চীন সফরের প্রচলিত কাহিনির সঙ্গে ৬৫১ সালের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের বিষয়টি আলাদা। চীনে ইসলাম বিস্তারের মূল চালিকাশক্তি ছিল সামরিক অভিযান নয়, বরং সমুদ্রপথের বাণিজ্য, অভিবাসন এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। ফলে স্থাপনাটি একই সঙ্গে চীনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ইসলামি পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। কোনো ধর্ম বা সভ্যতার বিস্তার সব সময় রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে ঘটে না।
অষ্টম শতাব্দীতে এসে চীনে মুসলিমদের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ৭৫১ সালের তালাসের যুদ্ধ এবং ৭৫৫ থেকে ৭৫৯ সালের আন লুশান বিদ্রোহের ঘটনাবলি চীন ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের পথকে নতুন মোড় দিয়েছিল। সে সময় গুয়াংজু ও ছুয়ানচৌয়ের মতো বন্দরনগরীগুলোতে আরব ও পারস্যের বণিকেরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের বৈবাহিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আরব ও পারস্যের মুসলিম বণিকেরা ভারত মহাসাগর, মালাক্কা প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করে চীনের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াত করতেন। তাদের অনেকে ব্যবসার প্রয়োজনে চীনে অবস্থান শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। মসজিদটি পরবর্তী মিং ও ছিং রাজবংশের সময়ে একাধিকবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
বর্তমান চীনে হুই এবং উইঘুর ছাড়াও কাজাখ, কিরগিজ, তাজিক, তাতার, সালার ও দংজিয়াং জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। হুই মুসলিমদের একটি বড় অংশ চীনা ভাষাভাষী এবং তাদের ইতিহাস আরব বণিকদের আগমন ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অভিযোজনের ফল। অন্যদিকে, উইঘুর মুসলিমদের সংস্কৃতি ও ভাষা মধ্য এশিয়ার তুর্কি সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিয়ানের প্রাচীন মসজিদটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার পারস্পরিক যোগাযোগ, জ্ঞানচর্চা ও সহাবস্থানের জীবন্ত সাক্ষী। এর বর্তমান স্থাপত্যবিন্যাস মূলত মিং আমলের বৈশিষ্ট্য বহন করে। প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় স্থাপত্যের ধারাবাহিকতাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।





















