চট্টগ্রাম বন্দরে সিসিটি পরিচালনার আগ্রহ সৌদি কোম্পানির, বিনিয়োগের পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি পরিচালনার সফলতার ধারাবাহিকতায় এবার চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটির দিকে নজর দিয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)। দুই বছর ধরে পিসিটি পরিচালনার মাধ্যমে অর্জিত সক্ষমতাকে পুঁজি করে তারা এখন নতুন এই টার্মিনালটির দায়িত্ব পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে তারাই এসব টার্মিনাল পরিচালনা করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির হেড অব কমার্শিয়াল সৈয়দ আরেফ সারোয়ার জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তারা পিসিটির দায়িত্ব গ্রহণ করে।
শুরুর দিকে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও বর্তমানে তাদের কাজের গতি সন্তোষজনক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে পিসিটিতে ৩৪টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালে ৭৮টি এবং চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, শুরুতে আধুনিক সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমানে সেই সংকট কেটেছে এবং তারা এনসিটির তুলনায় ভালো কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে।
সিসিটির দায়িত্ব পেলে সেখানে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে সেটিকেও পিসিটির মতো অত্যাধুনিক টার্মিনালে রূপান্তরের পূর্ণ পরিকল্পনা তাদের রয়েছে বলে সৈয়দ আরেফ সারোয়ার উল্লেখ করেন। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং সরকারি পর্যায় থেকে এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারও তাদের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেয় গত সেপ্টেম্বর মাসেই। টার্মিনাল পরিচালনার অনুমতি পেলে অন্তত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিতে দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর গত ৮ অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বর্তমানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। তবে এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্দর শ্রমিক, কর্মচারী ও সুশীল সমাজের একটি অংশ বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও কালো পতাকা প্রদর্শনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। নির্বাচিত সরকার আমলেও একই দাবিতে বিক্ষোভ, কালো পতাকা মিছিল, মশাল মিছিলের মতো কর্মসূচি এখনো অব্যাহত রেখেছেন আন্দোলনকারীরা। সেই সিদ্ধান্ত যদি জনগণের বিরুদ্ধে যায় তবে জনগণই তা প্রতিরোধ করবে।
বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিদেশি কোম্পানির আড়ালে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে। তার দাবি, দেশীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কেন বারবার স্পর্শকাতর সরকারি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। তিনি আন্দোলনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। আর এই কারণেই একের পর এক রেডি পোর্ট বা প্রস্তুত টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় টার্মিনালটি আরএসজিটিআইকে দেওয়া হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
টার্মিনালটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক নিয়ে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) এবং বন্দর বিশেষজ্ঞ জাফর আলম। তিনি বলেন, সিসিটি তুলনামূলক বেশ ছোট টার্মিনাল। ৪৫০ মিটারের এই জিটিতে চারটি গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে। সেখানে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিসিটিতে ৪ লাখ ৩১ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যার মধ্যে ২ লাখ ২৪ হাজার আমদানি ও ২ লাখ ৬ হাজার রপ্তানি কনটেইনার ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টির অবস্থান এনসিটিতে হলেও বাকি চারটির অবস্থান রয়েছে সিসিটিতে।
জাফর আলম আরও বলেন, সরকারিভাবে জিটুজি পদ্ধতিতে রেড সি গেটওয়েকে সিসিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে বর্তমান বিনিয়োগ আইনের আওতায় উন্মুক্ত টেন্ডারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন জিটুজি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তার মতে, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও অংশ নিত, যার ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ত এবং দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হতো।
ইতোমধ্যে আরএসজিটিআই তাদের পিসিটির অভিজ্ঞতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সিসিটির অপারেশনাল দায়িত্ব পাওয়ার জন্য পিপিপি মডেলে চিঠি দিয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং দেশীয় অপারেটরদের বাদ দিয়ে টার্মিনাল হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুরুতে সক্ষমতার ধারে-কাছে যেতে না পারলেও বর্তমানে অপারেশনাল কাজে বেশ সফলতা দেখাতে শুরু করেছে আরএসজিটিআই। তবে কোনো প্রতিযোগিতায় না গিয়ে আগের মতোই পিপিপি পদ্ধতিতে সিসিটির অপারেশন করতে আগ্রহের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে তারা। তারা কোথায় কীভাবে এই টাকা বিনিয়োগ করতে চায় আমার জানা নেই। তবে দেশি অপারেটর থেকে বিদেশি অপারেটর এলে সক্ষমতা বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।























