বিলুপ্তপ্রায় শকুন রক্ষায় প্রয়োজন জনসচেতনতা ও উদ্যোগ
গ্রাম-বাংলার লোককথায় শকুন নিয়ে অনেক অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত ছিল। একসময় গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা শকুনকে অমঙ্গলের প্রতীক মনে করতেন। কোনো বাড়ির ওপর দিয়ে শকুন উড়ে গেলে গোয়ালঘরের গরু রক্ষায় ধোঁয়া দেওয়ার প্রচলন ছিল। কামারখন্দ উপজেলার ১০৪ বছর বয়সী প্রবীণ জসিম উদ্দিন জানান, শকুন সাধারণত অসুস্থ বা মুমূর্ষু প্রাণীর চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করে। একটি শকুন মাটিতে নামলে অন্যরা তাকে অনুসরণ করে ভিড় জমায়। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই বিশ্বাস এখন আর নেই, শকুনও আজ প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। কামারখন্দ উপজেলা বয়োবৃদ্ধ জসিম উদ্দিন (১০৪) জানায়, এরা অসুস্থ আর মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে শিকারী পাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে প্রাণিটি মরার পর্যন্ত অপেক্ষা করে। গ্রাম-বাংলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে রূপকথার গল্প। যার কিছুটা সত্যি হলেও অধিকাংশই ছিল কাল্পনিক। যদিও প্রবীণরা এর উপর বিশ্বাস রেখে তাদের জীবন পরিচালনা করত। আলোচিত এই পাখি যখন কোনো বাড়ির উপর দিয়ে অতিক্রম করত তখন দাদি-নানিরা বলত, ‘এই গেদি মরার হগুন উড়ত্যাছে-গোয়াল ঘরে ধুমা দে (শকুন উড়ছে, গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দাও)। গোয়ালের গরু রক্ষায় তারা মাটির পাত্রে তুষের আগুন জ্বালিয়ে গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দিত।
শকুন মূলত প্রশস্ত ডানায় ভর করে আকাশে অনেক উঁচুতে উড়তে অভ্যস্ত। এদের মাথা ও ঘাড়ে কোনো পালক নেই। এরা বায়ুপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে চলাচল করে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে বট, পাকুড় বা ডুমুর গাছে বাসা বাঁধে। গুহা, পর্বতের চূড়া বা গাছের কোটরে এরা সাধারণত ১ থেকে ৩টি সাদা বা ফ্যাকাসে রঙের ডিম পাড়ে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে এরা বেশিক্ষণ অবস্থান করে না।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ এ কে এম আনোয়ারুল হক জানান, বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। এদের তালিকায় রয়েছে বাংলা শকুন, সরু ঠোঁটি শকুন, রাজ শকুন, কালো শকুন এবং হিমালয়ান শকুন। এছাড়া হিমালয়ান শকুন ও ইউরেশীয় শকুন অতিথি পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসে। ২ প্রজাতির অতিথি পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শকুনের ভূমিকা অপরিসীম। একমাত্র এই প্রাণীটিই রোগাক্রান্ত মৃত পশুর মাংস খেয়ে হজম করতে সক্ষম। মেডিসিন গবেষক ড. লিন্ডসের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, শকুন অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা ও খুরারোগের সংক্রমণ থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করে। বাংলাদেশে ডাইক্লোফেনাকের অতিরিক্ত ব্যবহারই শকুন বিলুপ্তির মূল কারণ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অতীতে প্রচুর শকুন থাকলেও এখন মানুষের ঢিল, ফাঁদ ও নির্যাতনের কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তাদের কথা তামিল করতে বউ-ছেলে-মেয়েরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠত।
পরিবেশ রক্ষায় শকুন বাঁচিয়ে রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই পাখি সংরক্ষণে সবার সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।


















