4:46 pm, Saturday, 7 November 2026

শ্রমিক অসন্তোষে পোশাক শিল্পে হাজার কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের টানা বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই অস্থিরতার ফলে শত শত কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন যানবাহন ও স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ কয়েকদিনের আন্দোলনে তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সরাসরি সম্পদহানি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের প্রকৃত ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সপ্তাহ খানেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব ঘটনায় সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জানিয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শুধুমাত্র পোশাক খাত নয়, বরং অন্যান্য শিল্প খাতের কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, গত ১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর পরদিন ২ নভেম্বর ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আরও ৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই দুই দিনে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রথম দুইদিনেই প্রায় প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ।

অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় ৩ নভেম্বর ১৫০টি, ৪ নভেম্বর ২০০টি এবং ৫ নভেম্বর ৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সব মিলিয়ে পরবর্তী তিন দিনে আরও ৪২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ রপ্তানি ব্যাহত হয়। এ হিসাবে, আলোচ্য সময়ে রপ্তানিকারকরা ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২০ থেকে ২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া শুধু গাজীপুরেই গত ছয়দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। তবে বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে সময়ের আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকায় সব যোগ করলে সঠিক পরিমাণ পাওয়া কঠিন। তবুও আন্দোলনের এই কয়েক দিনে মোট ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তার কারণে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। কারখানা বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ, গ্যাস, প্রশাসনিক ব্যয় ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয়গুলো নিয়মিত বহন করতে হয়, যা মালিকপক্ষের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট দু’টি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে, যেগুলোর প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার ডলার। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা ও গুদামে আগুন এবং মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান জানান, শ্রমিকরা কারখানায় এসে আন্দোলনে যোগ দেয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি। এতে কয়েক কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই অস্থিরতায় পণ্য জাহাজীকরণে দেরি হলে জরিমানা কিংবা আকাশপথে অতিরিক্ত খরচে পণ্য পাঠানোর মতো বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হবে রপ্তানিকারকদের। এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভের ফলে পোশাক খাতে যা ঘটছে তা কাম্য নয়। এই বিশৃঙ্খলা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বছরের মোট রপ্তানি আদেশের একটি বড় অংশের ক্রয়াদেশ এ সময়েই আসে।

Please Share This Post in Your Social Media

Update Time : 02:05:31 am, Saturday, 7 November 2026

শ্রমিক অসন্তোষে পোশাক শিল্পে হাজার কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

Update Time : 02:05:31 am, Saturday, 7 November 2026

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের টানা বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই অস্থিরতার ফলে শত শত কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন যানবাহন ও স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ কয়েকদিনের আন্দোলনে তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সরাসরি সম্পদহানি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের প্রকৃত ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সপ্তাহ খানেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব ঘটনায় সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জানিয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শুধুমাত্র পোশাক খাত নয়, বরং অন্যান্য শিল্প খাতের কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, গত ১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর পরদিন ২ নভেম্বর ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আরও ৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই দুই দিনে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রথম দুইদিনেই প্রায় প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ।

অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় ৩ নভেম্বর ১৫০টি, ৪ নভেম্বর ২০০টি এবং ৫ নভেম্বর ৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সব মিলিয়ে পরবর্তী তিন দিনে আরও ৪২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ রপ্তানি ব্যাহত হয়। এ হিসাবে, আলোচ্য সময়ে রপ্তানিকারকরা ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২০ থেকে ২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া শুধু গাজীপুরেই গত ছয়দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। তবে বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে সময়ের আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকায় সব যোগ করলে সঠিক পরিমাণ পাওয়া কঠিন। তবুও আন্দোলনের এই কয়েক দিনে মোট ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তার কারণে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। কারখানা বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ, গ্যাস, প্রশাসনিক ব্যয় ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয়গুলো নিয়মিত বহন করতে হয়, যা মালিকপক্ষের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট দু’টি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে, যেগুলোর প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার ডলার। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা ও গুদামে আগুন এবং মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান জানান, শ্রমিকরা কারখানায় এসে আন্দোলনে যোগ দেয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি। এতে কয়েক কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই অস্থিরতায় পণ্য জাহাজীকরণে দেরি হলে জরিমানা কিংবা আকাশপথে অতিরিক্ত খরচে পণ্য পাঠানোর মতো বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হবে রপ্তানিকারকদের। এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভের ফলে পোশাক খাতে যা ঘটছে তা কাম্য নয়। এই বিশৃঙ্খলা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বছরের মোট রপ্তানি আদেশের একটি বড় অংশের ক্রয়াদেশ এ সময়েই আসে।