সংরক্ষণের অভাবে হুমকির মুখে সিলেটের সুলতানি আমলের গায়েবি মসজিদ
সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে সুলতানি আমলের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক রাজকীয় স্থাপনা স্থানীয় পর্যায়ে ‘গায়েবি’ নামেই পরিচিত। জনশূন্যতার কালে দীর্ঘ সময় জঙ্গল ও মাটির স্তরে ঢাকা পড়ে থাকার পর স্থানীয়রা এসব স্থাপনা উদ্ধার করেছিলেন। নির্মাতা ও নির্মাণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় গ্রামবাসী এসব স্থাপনাকে অলৌকিক বা গায়েবি আখ্যা দিয়ে আসছেন। যুগের পর যুগ অব্যবহৃত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকায় এর অনেক অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে, স্থানীয় জনশূন্যতার কাল শেষ হওয়ার পর জঙ্গল কেটে কিংবা মাটি খুঁড়ে মানুষ এসব রাজকীয় স্থাপনা উদ্ধার করেছে। পুকুর বা দিঘির ক্ষেত্রেও মানুষ এই ‘গায়েবি’ শব্দ ব্যবহার করেছে। স্থাপনাগুলোতে আবর্জনা ও মাটির স্তরও জমেছিল। আক্ষরিক অর্থেই মানুষ জঙ্গল কেটে কিংবা মাটি সরিয়ে এগুলোকে বের করে এনেছিল। কিন্তু গায়েবি পরিচয়টি আর কখনোই মুছে যায়নি।
ওসমানীনগর উপজেলার উছমানপুর গ্রামের গায়েবি মসজিদটি এই ঘরানার অন্যতম নিদর্শণ। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি এতটাই শৈল্পিক যে এটি কোনো সুলতান, নবাব বা দেওয়ান-ফৌজদারের শাসনামলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। গম্বুজটি ছাদের পুরোটা জুড়ে বিস্তৃত এবং এর উচ্চতাও বেশ লক্ষণীয়। মসজিদের চার কোণায় থাকা চারটি মিনার এর নান্দনিকতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরু দেয়ালের এই মসজিদে নির্মাণশৈলীর যে দক্ষতা ফুটে উঠেছে, তা তখনকার উন্নত কারিগরি জ্ঞানের পরিচায়ক। প্রকাশ্যে আসার পর এগুলোর উন্নয়ন হয়েছে। এই মসজিদটি দেখতে এতটাই রাজকীয় যে, কোনো নবাব-সুলতান বা দেওয়ান-ফৌজদার ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এটি নির্মাণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গম্বুজের চূড়া ভূমি থেকে বেশ উঁচুতে। এত বড় ও উঁচু গম্বুজ নির্মাণের মূল কারণ বোধ হয় এটাই যে, মসজিদের নির্মাতা ভেতরে কোনো আর্চ বা খিলান নির্মাণে ইচ্ছুক ছিলেন না। ভেতরে একটি খিলান থাকলে ছাদের উপর দুটি এবং দুটি খিলান থাকলে ছাদে তিনটি গম্বুজ বসানো যেত। খিলান বাদ দেওয়ায় একটি বড় গম্বুজ নির্মাণ করেই মসজিদটির ছাদ পূর্ণ করতে হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সংস্কারকাজের ফলে আগের আমলের কারুকাজের অনেকটাই হারিয়ে গেছে, তবু যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা থেকে নির্মাতার উন্নত রুচি ও শৈল্পিক মনের পরিচয় স্পষ্টভাবেই ফুটে ওঠে। ভেতরের দেয়ালের পাশাপাশি বাইরের দেয়ালেও কিছু কারুকাজ রয়েছে, যা মসজিদটির বাইরের চেহারাকে অনেক আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রবেশদ্বার ও আলোকদ্বারগুলো থেকে এর পুরুত্বের ধারণা পাওয়া যায়।
মসজিদটির কোনো শিলালিপি না থাকায় এর সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে পাশের গ্রাম পশ্চিম তিলাপাড়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি মসজিদের শিলালিপিকে সূত্র হিসেবে ধরে ঐতিহাসিকরা এর বয়স নির্ধারণের চেষ্টা করেন। ওই শিলালিপিতে ১৪৭৯ সালের উল্লেখ রয়েছে, যখন বাংলার সুলতান ছিলেন শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ। সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মিল থাকায় গবেষকদের ধারণা, উছমানপুর গ্রামের এই মসজিদটিও সেই একই সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। এতে উল্লিখিত সাল ১৪৭৯।
বর্তমানে মসজিদটি সংরক্ষণের অভাবে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় নাম না থাকায় সরকারি কোনো গবেষণা বা পর্যালোচনার সুযোগ এখানে তৈরি হয়নি। এমতাবস্থায় স্থানীয় মসজিদ পরিচালনা কমিটি বর্তমান প্রাচীন মসজিদটিকে কেন্দ্র করে নতুন ও বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, প্রাচীন মসজিদের তিন পাশ দিয়ে নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে।
মসজিদ কমিটির ভাষ্যমতে, পূর্ব পাশের জায়গা মক্তবের জন্য সংরক্ষিত থাকায় উত্তর ও দক্ষিণ দিকের খালি জায়গায় নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, উত্তর পাশে কাচের দেয়াল ব্যবহার করা হবে যাতে তাজপুর-বালাগঞ্জ সড়ক থেকে প্রাচীন এই স্থাপনাটি দেখা যায়। তবে সচেতন মহলের আশঙ্কা, মূল কাঠামোর চারপাশে নতুন ভবন নির্মিত হলে প্রাচীন এই প্রত্নসম্পদের স্বকীয়তা ও সৌন্দর্য স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে এবং নির্মাণকাজ চলার সময় স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদটি রক্ষার আহ্বানে সম্প্রতি উছমানপুর গ্রাম সফর করেছেন নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। এই দলে ছিলেন সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ভাষাসৈনিক মতিন উদদীন আহমদ জাদুঘরের পরিচালক মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার, ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ ট্রাস্টের সেক্রেটারি আব্দুল করিম চৌধুরী কিম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, ইতিহাস গবেষক আসিফ আযহার এবং সাংবাদিক আব্দুর রহমান হীরাসহ অন্যরা। প্রতিনিধিরা মনে করেন, নতুন মসজিদ নির্মাণের সময় প্রাচীন স্থাপনার কোনো ক্ষতি করা অনুচিত হবে এবং এর যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।




















