পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে নাসার পুরোনো মহাকাশযান সুইফট
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি পুরোনো মহাকাশ পর্যবেক্ষণযান ‘নিল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি’ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কেজি ওজনের এই যানটি উৎক্ষেপণের ২২ বছর পর বুধবার (৪ নভেম্বর) তার কর্মজীবনের ইতি টানছে। নাসার তথ্যমতে, বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে যানটির বড় অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও কিছু ধাতব ধ্বংসাবশেষ ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এতে সাধারণ মানুষের হতাহতের ঝুঁকি খুবই কম; গাণিতিক হিসাবে প্রতি ২ হাজার ১০০ জনে একজনের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নাসার হিসাবে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় কারও হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা ২ হাজার ১০০ জনে একজন। তবে ঠিক কখন মহাকাশযানটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তা নিশ্চিত নয়। এ সময়ের দুই ঘণ্টা আগে-পরে হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কেন পৃথিবীতে ফিরে আসছে মহাকাশযানটি।
মহাকাশযানটির ধ্বংসাবশেষ বিষুবরেখার উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রি এলাকার মধ্যে পড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে নাসা।
এই বিশাল ঝুঁকির আওতায় রয়েছে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ভূখণ্ড। এছাড়া মহাসাগরগুলোতেও এর টুকরো পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অ্যারোস্পেস করপোরেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ১৯ মিনিটে এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে, তবে এই সময় নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। মার্কিন স্পেস ফোর্সের হিসাব অনুযায়ী, সময়টি বিকেল ৫টা ৪২ মিনিট হতে পারে। এ ছাড়া প্রশান্ত, আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও ধ্বংসাবশেষ পড়তে পারে।
২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ডেল্টা-২ রকেটের মাধ্যমে এই যানটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। মূলত গামা-রে বিস্ফোরণ, কৃষ্ণগহ্বরের সক্রিয়তা এবং মহাজাগতিক বিভিন্ন ঘটনার পর্যবেক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত কয়েক বছরে সূর্যের অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল প্রসারিত হওয়ায় মহাকাশযানটির ওপর ঘর্ষণ বেড়ে যায়, যা এটিকে ধীরে ধীরে কক্ষপথ থেকে নিচে নামিয়ে আনে। একপর্যায়ে সুইফট পৃথিবী থেকে মাত্র ২৭৫ কিলোমিটার উচ্চতায় নেমে এলে গত ২০ অক্টোবর নাসা এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়। মহাকাশযানটির কার্যক্রম আরও অন্তত এক দশক বাড়ানোর লক্ষ্যে গত জুলাইয়ে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয় নাসা। এরপর বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ বন্ধ করে দেয় নাসা।
সুইফটকে দীর্ঘ সময় সচল রাখার জন্য গত জুলাই মাসে অ্যারিজোনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট স্পেস টেকনোলজিসের মাধ্যমে ‘লিংক’ নামের একটি যান পাঠিয়ে উদ্ধার অভিযানের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে উৎক্ষেপণের কয়েক সপ্তাহ পরেই সেই যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় অভিযানটি ব্যর্থ হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নাসা এখন ভবিষ্যতে অন্য মহাকাশযানের আয়ু বাড়ানোর নতুন পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
নাসার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপ ২০৩২ সালের মধ্যে কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে ১০ শতাংশ। ২০৩৩ সালের মধ্যে সেই ঝুঁকি বেড়ে ৫০ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, হাবলের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা ২০৪০ সালের আগে প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সুইফটের এই পতন এবং হাবলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে সুইফটের পতনের পাশাপাশি হাবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে মহাকাশ গবেষকদের।




















