ট্রাম্প যুগের অবসান: মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মোড়
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের একটি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের বার্তা তুলে ধরেছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। ১৯৮৬ সালে প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচন কভার করেন তিনি। এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি নিতে চায় ভারত। এতে দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচন ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বিশাল পরীক্ষা এবং বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প ভোটারদের বারবার আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা ব্যালটে নিজেদের ভোটটিকে তার নিজের প্রতি আস্থা হিসেবে দেখেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুধবার (৪ নভেম্বর) জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প ভোটারদের বারবার বলেছিলেন, ‘এমনভাবে ভোট দিন, যেন ব্যালটে আমার নাম আছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি। তবে নির্বাচনে ভরাডুবির পরপরই নিজের অবস্থান সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন ট্রাম্প।
শুধু এই শরতেই তিনি অন্তত ৪৭ বার ভোটারদের উদ্দেশ্যে এমন বার্তা দিয়েছেন।
প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোর জন্য জাতীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ব্যবধান প্রায় ১৩ শতাংশ হতে পারে বলে বুধবার ভোর পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে জানা গেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, অন্তত ১৯৭৬ সালের পর থেকে কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দল এতটা বড় ব্যবধানে জয় পায়নি। বিল ক্লিনটনের শাসনামলে ১৯৯৪ সালে এবং বারাক ওবামার সময়ে ২০১০ সালে রিপাবলিকানরা যে জয় পেয়েছিল, এবারের ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান সেই ঐতিহাসিক জয়ের চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে। রিপাবলিকানদের হটিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থীর পরাজয় তাঁর হস্তক্ষেপের পরিণতি সামনে এনেছে। তুলনামূলক বেশি জয়ের সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তিনি কেন প্যাক্সটন ও ডারলিন গ্রাহামকে বেছে নিয়েছিলেন, এখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরির পেছনে জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের অভিযোগগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের কৌশলও রিপাবলিকানদের জন্য খুব একটা কার্যকর হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যাম্পাসের অধ্যাপক লিন ভ্যাভরেকের মতে, যদিও ‘মাগা’ জোট পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে না, তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় যে ভাটা পড়েছে তা স্পষ্ট। রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প। নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা সাজিয়ে নেয়ায় এখন বিরোধী দলের পক্ষে অন্য দলের আসন কেড়ে নেয়া আগের চেয়ে কঠিন। এ ছাড়া ক্ষমতায় থেকে নিজের অর্থ উপার্জনের নৈতিকতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নও তিনি এড়িয়ে গেছেন।
সাবেক ডেমোক্র্যাট মেয়র রাহম ইমানুয়েলের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, মাগা-সমর্থক নন এমন অনেক রিপাবলিকান তাদের দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের এই মোড় পরিবর্তনের মুহূর্তে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, রিপাবলিকান পার্টিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে তাদের মূলনীতিতে ফিরে যেতে হবে। যদিও ২০২৭ সাল নাগাদ কী হবে তা বর্তমান পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে। তাঁর এই বক্তব্য শুনে অনেক রিপাবলিকানও বিরক্তি প্রকাশ করবেন।
নিজেদের হারের দায় পুরোপুরি নিতে নারাজ ট্রাম্প। মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ডেমোক্র্যাটদের কাছে এই পরাজয় তার বিরুদ্ধে কোনো রায় নয়। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না, আর আমি ব্যালটে না থাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি।’ তার এই দাবি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও বিরক্তির জন্ম দিয়েছে, কারণ পুরো নির্বাচনী প্রচারণাটিই আবর্তিত হয়েছিল ট্রাম্পকে ঘিরে এবং তিনি দলের প্রার্থীদের কাছে নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করেছিলেন।
পিটার বেকার তার বিশ্লেষণ-নিবন্ধ ‘হিস্টোরিক মিডটার্ম রাউট সার্ভস অ্যাজ আ সুইপিং রিপিউক অব ট্রাম্প এরা’-তে লিখেছেন যে, ট্রাম্পের আগের কোনো প্রেসিডেন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের এমন বড় পরীক্ষায় পরিণত করেননি। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস বি. সোসনিকের মতে, এই পরাজয় মূলত ট্রাম্প এবং গত দুই বছরে রিপাবলিকান পার্টির কার্যক্রমের প্রতি ভোটারদের নেতিবাচক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্প নিজেই এবারের নির্বাচনকে তাঁর শাসনামলের ওপর গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন।
ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের উপদেষ্টা জো গ্রোগান মন্তব্য করেছিলেন যে, ফলাফলের যাই হোক না কেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির চেহারা চিরতরে বদলে দিয়েছেন। তার মতে, রিপাবলিকান পার্টি আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। তবে অনেক ভোটার যারা জরিপে অংশ নিয়েছেন, তারা জানিয়েছেন যে ট্রাম্প তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠকিয়েছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন যুদ্ধ বন্ধের আশায় ভোটাররা যে প্রতিশ্রুতি চেয়েছিলেন, তার প্রতিফলন ঘটেনি। দুবার ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দেয়া ভোটার জোটের ওপরও তাঁর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ আর নেই। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন বহিরাগত নেতার ওপর যারা একসময় আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সোসনিকের মতে, নির্বাচনের পরদিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করবে। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে নির্বাচনের ইস্যু, কৌশল ও প্রচারের বার্তা—সবকিছুই নির্ধারণ করেছেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির সাহস অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী দেখাতে পারেননি। তাঁরা ভেবেছিলেন, তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাবেন, নতুন যুদ্ধ শুরু করবেন না।
ইতিহাস বলছে, ১৯৭৪ সালের ওয়াটারগেট-পরবর্তী সময়ে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক বিলুপ্তির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল, কিন্তু ছয় বছরের মাথায় তারা ক্ষমতায় ফিরেছিল।
তেমনি ১৯৯৪ ও ২০১০ সালের ফলাফল নিয়েও নানা জল্পনা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা এম. গ্রিয়ারের মতে, ডেমোক্র্যাটদের এই বিশাল জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এক নতুন পর্যায়ের সূচনালগ্ন হতে পারে, যেখানে পরিবর্তনের হাওয়া আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।




















