12:02 pm, Thursday, 29 October 2026

কাজের খোঁজে গ্রাম ছাড়া উত্তরের হাজারো দিনমজুর

আশ্বিনের শেষ ও কার্তিকের শুরু—এই সময়টাতে কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলের মাঠগুলো থাকে অনেকটাই ফাঁকা। কৃষিভিত্তিক কোনো কাজ না থাকায় লালমনিরহাটের হাজার হাজার দিনমজুর কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পরিবার নিয়ে অভাবের তাড়নায় দিশেহারা এসব মানুষ এখন কাজের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে ভিড় জমাচ্ছেন কর্মহীন শ্রমজীবীরা। হাতে সামান্য টাকা নিয়ে বাসের ছাদ বা ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে চরম ঝুঁকি নিয়ে তারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকে পুরো বাস বা ট্রেন ভাড়া না পেয়ে বাসের ছাদ অথবা ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে গাদাগাদি করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি দিচ্ছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাটের অর্থনীতির প্রায় ৬৫ শতাংশই কৃষিনির্ভর। এলাকায় বড় কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠায় ধান, পাট, তামাক ও ভুট্টা চাষই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে কাজের সংকটে বিপাকে পড়ছেন অতিদরিদ্ররা। সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় দিশেহারা হয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ পরিবার শহরমুখী হয়েছে। এছাড়া আরও ১৫ শতাংশ মানুষ ভালো কিছুর আশায় নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়েছেন। এছাড়া প্রতিবছর নদীভাঙনও মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করছে। সরেজমিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের অতিদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এই সংকটে পড়েছেন। এক নমুনা জরিপে দেখা গেছে, মফস্বলের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাবোধ সবচেয়ে বেশি।

বৃহস্পতিবার সকালে লালমনিরহাট বাসস্ট্যান্ডে দেখা মেলে অনেক অসহায় শ্রমিকের। পাটগ্রামের বড়খাতা ইউনিয়নের মফিজুল ইসলাম ও আদিতমারীর গোবর্ধন এলাকার তাজুল ইসলামের ভাষ্যমতে, অভাবের সময় গ্রামীণ মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আগের দাদনের টাকা শোধ করতে না পারায় নতুন করে ঋণ মিলছে না। ২৫ শতাংশ মাসিক সুদে ধার নেওয়া সামান্য টাকা পরিবারের খোরাকি ও যাতায়াত ভাড়ায় খরচ করে মাত্র ৮০-৯০ টাকা হাতে নিয়ে তারা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। পাটগ্রাম উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের মফিজুল ইসলাম (৩৮) এবং আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধন এলাকার তাজুল ইসলাম (৪৮) জানান, অভাবের সময় দাদনের টাকা শোধ করতে না পারায় নতুন করে দাদন মিলছে না।

হাতীবান্ধার গড্ডিমারী চরের দিনমজুর কবির হোসেন জানান, বর্তমানে কাজের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি, যার ফলে গ্রামে কাজ পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একইভাবে পাটগ্রামের বড়খাতা ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা জানান, গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান না থাকায় পুরুষরা দূর শহরে গেলেও নারীরা বেকার বসে থাকছেন। এমনকি গ্রামের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ পর্যন্ত জুটছে না। অথচ জেলায় বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও গ্যাস সংযোগ ও অবকাঠামোর অভাবে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে। হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত গড্ডিমারী চরের দিনমজুর কবির হোসেন (৫৫) জানান, কাজের পরিমাণ কমলেও শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, তাই বাধ্য হয়েই তিনি শহরের পথ ধরেছেন।

এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, স্থানীয় পর্যায়ে চরম দারিদ্র্য, রোগ-শোক ও জমি দখলের আতঙ্কের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো মানুষের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। শ্রমিক অধিকার নেতা রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে শহরমুখী মানুষের এই ঢল আগামী দিনে আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উত্তরের মৌসুমি বেকারত্ব কাটাতে কারিগরি শিক্ষা ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এখন সময়ের দাবি।

Please Share This Post in Your Social Media

Update Time : 04:36:35 am, Thursday, 29 October 2026

কাজের খোঁজে গ্রাম ছাড়া উত্তরের হাজারো দিনমজুর

Update Time : 04:36:35 am, Thursday, 29 October 2026

আশ্বিনের শেষ ও কার্তিকের শুরু—এই সময়টাতে কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলের মাঠগুলো থাকে অনেকটাই ফাঁকা। কৃষিভিত্তিক কোনো কাজ না থাকায় লালমনিরহাটের হাজার হাজার দিনমজুর কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পরিবার নিয়ে অভাবের তাড়নায় দিশেহারা এসব মানুষ এখন কাজের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে ভিড় জমাচ্ছেন কর্মহীন শ্রমজীবীরা। হাতে সামান্য টাকা নিয়ে বাসের ছাদ বা ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে চরম ঝুঁকি নিয়ে তারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকে পুরো বাস বা ট্রেন ভাড়া না পেয়ে বাসের ছাদ অথবা ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে গাদাগাদি করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি দিচ্ছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাটের অর্থনীতির প্রায় ৬৫ শতাংশই কৃষিনির্ভর। এলাকায় বড় কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠায় ধান, পাট, তামাক ও ভুট্টা চাষই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে কাজের সংকটে বিপাকে পড়ছেন অতিদরিদ্ররা। সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় দিশেহারা হয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ পরিবার শহরমুখী হয়েছে। এছাড়া আরও ১৫ শতাংশ মানুষ ভালো কিছুর আশায় নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়েছেন। এছাড়া প্রতিবছর নদীভাঙনও মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করছে। সরেজমিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের অতিদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এই সংকটে পড়েছেন। এক নমুনা জরিপে দেখা গেছে, মফস্বলের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাবোধ সবচেয়ে বেশি।

বৃহস্পতিবার সকালে লালমনিরহাট বাসস্ট্যান্ডে দেখা মেলে অনেক অসহায় শ্রমিকের। পাটগ্রামের বড়খাতা ইউনিয়নের মফিজুল ইসলাম ও আদিতমারীর গোবর্ধন এলাকার তাজুল ইসলামের ভাষ্যমতে, অভাবের সময় গ্রামীণ মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আগের দাদনের টাকা শোধ করতে না পারায় নতুন করে ঋণ মিলছে না। ২৫ শতাংশ মাসিক সুদে ধার নেওয়া সামান্য টাকা পরিবারের খোরাকি ও যাতায়াত ভাড়ায় খরচ করে মাত্র ৮০-৯০ টাকা হাতে নিয়ে তারা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। পাটগ্রাম উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের মফিজুল ইসলাম (৩৮) এবং আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধন এলাকার তাজুল ইসলাম (৪৮) জানান, অভাবের সময় দাদনের টাকা শোধ করতে না পারায় নতুন করে দাদন মিলছে না।

হাতীবান্ধার গড্ডিমারী চরের দিনমজুর কবির হোসেন জানান, বর্তমানে কাজের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি, যার ফলে গ্রামে কাজ পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একইভাবে পাটগ্রামের বড়খাতা ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা জানান, গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান না থাকায় পুরুষরা দূর শহরে গেলেও নারীরা বেকার বসে থাকছেন। এমনকি গ্রামের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ পর্যন্ত জুটছে না। অথচ জেলায় বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও গ্যাস সংযোগ ও অবকাঠামোর অভাবে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে। হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত গড্ডিমারী চরের দিনমজুর কবির হোসেন (৫৫) জানান, কাজের পরিমাণ কমলেও শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, তাই বাধ্য হয়েই তিনি শহরের পথ ধরেছেন।

এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, স্থানীয় পর্যায়ে চরম দারিদ্র্য, রোগ-শোক ও জমি দখলের আতঙ্কের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো মানুষের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। শ্রমিক অধিকার নেতা রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে শহরমুখী মানুষের এই ঢল আগামী দিনে আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উত্তরের মৌসুমি বেকারত্ব কাটাতে কারিগরি শিক্ষা ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এখন সময়ের দাবি।