1:52 am, Saturday, 1 August 2026

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষক বিউটি পালের ভিডিও ও সৃজনশীলতার শক্তি

যেকোনো প্রতিবাদের ভাষা স্বাভাবিক কারণেই রূঢ় হয় এবং প্রয়াস সহিংস হয়। কিন্তু প্রতিবাদে সৃজনশীলতা যুক্ত হলে তাও রূপান্তরিত হতে পারে শিল্পে। একদা বাংলা অঞ্চলে সৃজনশীল প্রতিবাদের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর(১৮৬১-১৯৪১)।

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে সূচনায়, স্বদেশি আন্দোলনের সময় তিনি প্রবর্তন করেছিলেন রাখীবন্ধনের। ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে বিভেদের যে রাজনীতির সূচনা করেছিল সে বিভেদের বিরুদ্ধে এটা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণা। বিভেদের বিপরীতে বন্ধনের কর্মসূচি।

সর্বশেষ মজার প্রতিবাদটি সংগঠিত হয়েছিল তার গড়ে তোলা বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-শান্তিনিকেতনে। বছর কয়েক আগে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তার বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখে।

এক রাতে উপচার্য অভিযোগ করেন যে তাকে অনাহারে মেরে ফেলার চক্রান্ত চলছে। শিক্ষার্থীরা ভোরেই উপাচার্য ভবনের গেটে দুধ-কলা রেখে আসে। ব্যস, হাস্যরস ছড়িয়ে পড়ে। দুধকলা দিয়ে সাপ পোষার বাগধারাটি জনমানসে ফিরে আসে। আন্দোলন আরও রসালো ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের পর সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থানে পড়ে শিক্ষাঙ্গন। শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। শিক্ষার্থীরা নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে থাকে। প্রথমে তারা পরীক্ষা না দেওয়ার দাবিতে ঘেরাও করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়কে অটোপাস দিতে বাধ্য করে। তারপর তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেও নানা অরাজকতা সৃষ্টি করতে শুরু করে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্টরা লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে থাকেন। বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কাছে লাঞ্ছনার শিকার হন। জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে। সেসব ভিডিও অনলাইনে অহরহ আসতে থাকে। ফলে শিক্ষাঙ্গনের শিখন পরিবেশ পুরোটাই ভেঙে পড়ে।

শিক্ষকদের সম্মান এ দেশে এমনিতেই তলানিতে ছিল। অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলা, শিক্ষককে কানধরে উঠবস করানো, জুতার মালা পরানোর ঘটনাও এর আগে থেকেই রাজনৈতিক কারণেই ঘটে আসছিল। শিক্ষকরা এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলছে পারছিলেন না।

এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারারও একটি বড় কারণ ছিল শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে রাজনীতি ও নানান অনৈক্য। কোনো ইস্যুতে শিক্ষকরা কখনোই মতভেদ, দলাদলি ভুলে এক হতে পারছিলেন না এবং বলা যায় এ পরিস্থিতি ক্রমশই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এমনকি ক্লাসে প্রবেশ করে বহিরাগতদের মোরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা পর্যন্ত ঘটতে শুরু করেছিল।

রক্ষণশীলতা, সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ছিল। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল ও করছে। এ পরিস্থিতির ভেতর একটি সামান্য গানকে কেন্দ্র করে একদম ভিন্ন আবহ সৃষ্টি হয়েছে। গান ও প্রতিবাদটি অসামান্য হয়ে ওঠেছে।

শ্রাবণের মেঘের দিনে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিউটি পাল নীলশাড়ি পড়ে স্কুল মাঠে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সাথে নাচের ভিডিও করেন। সে ভিডিওটি তিনি তার ফেসবুক টাইমলাইনে আপলোড করেন।

আনন্দ প্রকাশের খুব সাধারণ একটি ভিডিও। কিন্তু সে ভিডিওটি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করেন স্থানীয় পত্রিকার এক সাংবাদিক। সে নেতিবাচক সংবাদটি গ্রহণ করে গোঁড়া, রক্ষণশীলরা। তারা শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। এতে অনলাইন দুনিয়ায় নানা বিতর্ক ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জন্ম হয়।

ভিডিওটি ভাইরাল হলে শিক্ষাঙ্গনে এ রকম আনন্দ প্রকাশ নৈতিক কিনা এ নিয়ে শিক্ষাজনেরাও মতামত প্রকাশ করতে থাকেন। নেতিবাচকতার পাশাপাশি ইতিবাচক মতামত নিয়েও অনেকে এগিয়ে আসতে থাকেন। এর মধ্যে শিক্ষকরা এক অভিনব, সৃজনশীল প্রতিবাদের ভাষা বেছে নেন।

তারা তাদের সহকর্মীর প্রতি সংহতি জানিয়ে একই গান ব্যবহার করে হাজার হাজার ভিডিও ও ছবি অনলাইনে আপলোড করতে থাকেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে আনন্দ প্রকাশের সমর্থনে জনমত তৈরি হয়। এই সামান্য গানকে কেন্দ্র করে বলা যায় প্রায় পুরো শিক্ষকসমাজ ঐক্যবদ্ধ হোন।

বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাই বলে শিক্ষা প্রশাসনের রক্ষণশীল অংশ তো বসে থাকেনি। এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্যেও তারা তদন্ত কমটি গঠনের ঘোষণা প্রদান করে। এ সময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিক্ষকের পক্ষে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, গান গাওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না।

কথাটি তিনি এমন এক পরস্পরায় বলেন, যখন সরকার শিক্ষাঙ্গনে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বেগবান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মন্ত্রীর কথার পর শিক্ষা প্রশাসনের রক্ষণশীল অংশ পিছিয়ে পড়ে। শিক্ষাঙ্গনে শালীন আনন্দ প্রকাশের জয় হয়। বিজয় হয়  সৃজনশীল প্রতিবাদের। কিন্তু এখন শিক্ষাবিদদের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে এ রকম আনন্দ প্রকাশ শিক্ষাতাত্ত্বিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য কিনা?

শিক্ষার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, গ্রিক আকাদামিয়ার জন্মই হয়েছিল গাছতলার উন্মুক্ত পরিবেশে। তারও আগে মানুষ যখন ভাষা আবিষ্কার করতে পারেনি তখন নাচই ছিল শিক্ষার অন্যতম, বলা যায় প্রধান বাহন।

স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়া প্রদেশে অবস্থিত আলতামিরা গুহায় আমরা বাইসন শিকারের লক্ষ্যে শিক্ষার যে আদি প্রশিক্ষণের রূপ দেখতে পায় তা ছিল যৌথ নৃত্য। প্রাণীজগতের শিশুরা এখনো এই আনন্দের ভেতর দিয়েই শিক্ষালাভ করতে দেখি। বাঘের বাচ্চা প্রথম তার মায়ের লেজ নিয়ে খেলা করে মায়ের পেছনে নাচতে নাচতে শিকার শেখে। অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও তাই। প্রধানত আনন্দময় খেলাধুলা বা নাচের ভেতর দিয়েই প্রাণীর শাবকরা শিক্ষা গ্রহণ করে।

মানুষের ভাষা আবিষ্কারের পরে যখন এক সময় পুঁথি আবিষ্কার হয় এবং শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে চার দেয়ালের ভেতর চলে যায় তখনই শিক্ষা অনেকটাই আবদ্ধ পুঁথিবদ্ধ ও আনন্দহীন হয়ে পড়তে থাকে।

তথাপি সক্রেটিস, রুশো, জন ডিউই থেকে রবীন্দ্রনাথ, জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি পর্যন্ত শিক্ষাবিদদের সবাই শিক্ষায় আনন্দময় পরিবেশের কথা বলেছেন। শিক্ষায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিয়েছেন।

পশ্চিমের শিক্ষার মূল বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে আনন্দের ভেতর দিয়ে শিক্ষা। শিক্ষক যদি অসৃজনশীল হন, নীরস হন, গোমড়ামুখো থাকেন শিশুরা কখনোই তার কাছ শিক্ষা নিতে আগ্রহী হবে না।

শিক্ষকরা সৃজনশীল হবেন, গাইবেন, নাচবেন, আনন্দময় হবেন তবে অবশ্যই তার ভেতর যেন শালীনতা বজায় থাকে। রুচি থাকে।  বিউটি পালের ভিডিওতে সে শালীনতা ছিল। শ্রাবণের দিনের মেঘের আনন্দ ছিল। প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ ছিল। ফলত অধিকাংশ মানুষ এ আনন্দ প্রকাশকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বিউটি পালের গণিত ক্লাসের আরেকটি ভিডিও অনলাইনে এসেছে। দেখা যাচ্ছে গণিতের মতো আপাত নীরস বিষয়কে তিনি সৃজনশীল আনন্দময় উপায়ে শিক্ষাদান করছেন। শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। শিক্ষার্থীরা আনন্দের ভেতর দিয়ে গণিত শিখছে।

বিউটি পালদের মতো সৃজনশীল শিক্ষকদের জয় হোক। আমাদের ক্লাসরুমগুলো শিশুদের কাছে আনন্দময় হয়ে উঠুক, শ্রাবণের  মেঘের দিনে এই কামনা।

ড. শোয়াইব জিবরান : কবি ও শিক্ষাবিদ; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক; সাবেক শিক্ষাপরামর্শক, ইউনিসেফ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষক বিউটি পালের ভিডিও ও সৃজনশীলতার শক্তি

Update Time : 04:46:42 pm, Friday, 31 July 2026

যেকোনো প্রতিবাদের ভাষা স্বাভাবিক কারণেই রূঢ় হয় এবং প্রয়াস সহিংস হয়। কিন্তু প্রতিবাদে সৃজনশীলতা যুক্ত হলে তাও রূপান্তরিত হতে পারে শিল্পে। একদা বাংলা অঞ্চলে সৃজনশীল প্রতিবাদের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর(১৮৬১-১৯৪১)।

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে সূচনায়, স্বদেশি আন্দোলনের সময় তিনি প্রবর্তন করেছিলেন রাখীবন্ধনের। ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে বিভেদের যে রাজনীতির সূচনা করেছিল সে বিভেদের বিরুদ্ধে এটা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণা। বিভেদের বিপরীতে বন্ধনের কর্মসূচি।

সর্বশেষ মজার প্রতিবাদটি সংগঠিত হয়েছিল তার গড়ে তোলা বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-শান্তিনিকেতনে। বছর কয়েক আগে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তার বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখে।

এক রাতে উপচার্য অভিযোগ করেন যে তাকে অনাহারে মেরে ফেলার চক্রান্ত চলছে। শিক্ষার্থীরা ভোরেই উপাচার্য ভবনের গেটে দুধ-কলা রেখে আসে। ব্যস, হাস্যরস ছড়িয়ে পড়ে। দুধকলা দিয়ে সাপ পোষার বাগধারাটি জনমানসে ফিরে আসে। আন্দোলন আরও রসালো ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের পর সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থানে পড়ে শিক্ষাঙ্গন। শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। শিক্ষার্থীরা নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে থাকে। প্রথমে তারা পরীক্ষা না দেওয়ার দাবিতে ঘেরাও করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়কে অটোপাস দিতে বাধ্য করে। তারপর তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেও নানা অরাজকতা সৃষ্টি করতে শুরু করে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্টরা লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে থাকেন। বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কাছে লাঞ্ছনার শিকার হন। জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে। সেসব ভিডিও অনলাইনে অহরহ আসতে থাকে। ফলে শিক্ষাঙ্গনের শিখন পরিবেশ পুরোটাই ভেঙে পড়ে।

শিক্ষকদের সম্মান এ দেশে এমনিতেই তলানিতে ছিল। অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলা, শিক্ষককে কানধরে উঠবস করানো, জুতার মালা পরানোর ঘটনাও এর আগে থেকেই রাজনৈতিক কারণেই ঘটে আসছিল। শিক্ষকরা এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলছে পারছিলেন না।

এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারারও একটি বড় কারণ ছিল শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে রাজনীতি ও নানান অনৈক্য। কোনো ইস্যুতে শিক্ষকরা কখনোই মতভেদ, দলাদলি ভুলে এক হতে পারছিলেন না এবং বলা যায় এ পরিস্থিতি ক্রমশই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এমনকি ক্লাসে প্রবেশ করে বহিরাগতদের মোরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা পর্যন্ত ঘটতে শুরু করেছিল।

রক্ষণশীলতা, সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ছিল। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল ও করছে। এ পরিস্থিতির ভেতর একটি সামান্য গানকে কেন্দ্র করে একদম ভিন্ন আবহ সৃষ্টি হয়েছে। গান ও প্রতিবাদটি অসামান্য হয়ে ওঠেছে।

শ্রাবণের মেঘের দিনে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিউটি পাল নীলশাড়ি পড়ে স্কুল মাঠে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সাথে নাচের ভিডিও করেন। সে ভিডিওটি তিনি তার ফেসবুক টাইমলাইনে আপলোড করেন।

আনন্দ প্রকাশের খুব সাধারণ একটি ভিডিও। কিন্তু সে ভিডিওটি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করেন স্থানীয় পত্রিকার এক সাংবাদিক। সে নেতিবাচক সংবাদটি গ্রহণ করে গোঁড়া, রক্ষণশীলরা। তারা শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। এতে অনলাইন দুনিয়ায় নানা বিতর্ক ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জন্ম হয়।

ভিডিওটি ভাইরাল হলে শিক্ষাঙ্গনে এ রকম আনন্দ প্রকাশ নৈতিক কিনা এ নিয়ে শিক্ষাজনেরাও মতামত প্রকাশ করতে থাকেন। নেতিবাচকতার পাশাপাশি ইতিবাচক মতামত নিয়েও অনেকে এগিয়ে আসতে থাকেন। এর মধ্যে শিক্ষকরা এক অভিনব, সৃজনশীল প্রতিবাদের ভাষা বেছে নেন।

তারা তাদের সহকর্মীর প্রতি সংহতি জানিয়ে একই গান ব্যবহার করে হাজার হাজার ভিডিও ও ছবি অনলাইনে আপলোড করতে থাকেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে আনন্দ প্রকাশের সমর্থনে জনমত তৈরি হয়। এই সামান্য গানকে কেন্দ্র করে বলা যায় প্রায় পুরো শিক্ষকসমাজ ঐক্যবদ্ধ হোন।

বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাই বলে শিক্ষা প্রশাসনের রক্ষণশীল অংশ তো বসে থাকেনি। এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্যেও তারা তদন্ত কমটি গঠনের ঘোষণা প্রদান করে। এ সময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিক্ষকের পক্ষে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, গান গাওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না।

কথাটি তিনি এমন এক পরস্পরায় বলেন, যখন সরকার শিক্ষাঙ্গনে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বেগবান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মন্ত্রীর কথার পর শিক্ষা প্রশাসনের রক্ষণশীল অংশ পিছিয়ে পড়ে। শিক্ষাঙ্গনে শালীন আনন্দ প্রকাশের জয় হয়। বিজয় হয়  সৃজনশীল প্রতিবাদের। কিন্তু এখন শিক্ষাবিদদের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে এ রকম আনন্দ প্রকাশ শিক্ষাতাত্ত্বিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য কিনা?

শিক্ষার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, গ্রিক আকাদামিয়ার জন্মই হয়েছিল গাছতলার উন্মুক্ত পরিবেশে। তারও আগে মানুষ যখন ভাষা আবিষ্কার করতে পারেনি তখন নাচই ছিল শিক্ষার অন্যতম, বলা যায় প্রধান বাহন।

স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়া প্রদেশে অবস্থিত আলতামিরা গুহায় আমরা বাইসন শিকারের লক্ষ্যে শিক্ষার যে আদি প্রশিক্ষণের রূপ দেখতে পায় তা ছিল যৌথ নৃত্য। প্রাণীজগতের শিশুরা এখনো এই আনন্দের ভেতর দিয়েই শিক্ষালাভ করতে দেখি। বাঘের বাচ্চা প্রথম তার মায়ের লেজ নিয়ে খেলা করে মায়ের পেছনে নাচতে নাচতে শিকার শেখে। অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও তাই। প্রধানত আনন্দময় খেলাধুলা বা নাচের ভেতর দিয়েই প্রাণীর শাবকরা শিক্ষা গ্রহণ করে।

মানুষের ভাষা আবিষ্কারের পরে যখন এক সময় পুঁথি আবিষ্কার হয় এবং শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে চার দেয়ালের ভেতর চলে যায় তখনই শিক্ষা অনেকটাই আবদ্ধ পুঁথিবদ্ধ ও আনন্দহীন হয়ে পড়তে থাকে।

তথাপি সক্রেটিস, রুশো, জন ডিউই থেকে রবীন্দ্রনাথ, জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি পর্যন্ত শিক্ষাবিদদের সবাই শিক্ষায় আনন্দময় পরিবেশের কথা বলেছেন। শিক্ষায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিয়েছেন।

পশ্চিমের শিক্ষার মূল বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে আনন্দের ভেতর দিয়ে শিক্ষা। শিক্ষক যদি অসৃজনশীল হন, নীরস হন, গোমড়ামুখো থাকেন শিশুরা কখনোই তার কাছ শিক্ষা নিতে আগ্রহী হবে না।

শিক্ষকরা সৃজনশীল হবেন, গাইবেন, নাচবেন, আনন্দময় হবেন তবে অবশ্যই তার ভেতর যেন শালীনতা বজায় থাকে। রুচি থাকে।  বিউটি পালের ভিডিওতে সে শালীনতা ছিল। শ্রাবণের দিনের মেঘের আনন্দ ছিল। প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ ছিল। ফলত অধিকাংশ মানুষ এ আনন্দ প্রকাশকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বিউটি পালের গণিত ক্লাসের আরেকটি ভিডিও অনলাইনে এসেছে। দেখা যাচ্ছে গণিতের মতো আপাত নীরস বিষয়কে তিনি সৃজনশীল আনন্দময় উপায়ে শিক্ষাদান করছেন। শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। শিক্ষার্থীরা আনন্দের ভেতর দিয়ে গণিত শিখছে।

বিউটি পালদের মতো সৃজনশীল শিক্ষকদের জয় হোক। আমাদের ক্লাসরুমগুলো শিশুদের কাছে আনন্দময় হয়ে উঠুক, শ্রাবণের  মেঘের দিনে এই কামনা।

ড. শোয়াইব জিবরান : কবি ও শিক্ষাবিদ; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক; সাবেক শিক্ষাপরামর্শক, ইউনিসেফ