12:29 pm, Friday, 4 September 2026

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশ, কিশোরও জড়াচ্ছে ধর্ষণে, বাড়ছে উদ্বেগ

ধর্ষণকাণ্ডের মতো ঘৃণ্য অপরাধে নাবালক তথা শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু মেয়েশিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় নাবালক ছেলেদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় হওয়া মামলায় পুলিশ অনেক কিশোরকে গ্রেফতারও করেছে। এসব কিশোরের বয়স ১৩-১৪ বছর। আগস্টে ধর্ষণের শিকার ৫৪ শিশুর মধ্যে ৩৬ জনই কন্যাশিশু। এর মধ্যে ৮ শিশুকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। এসব ধর্ষণকাণ্ডে জড়িত থাকায় কয়েকজন ছেলেশিশুকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

৩০ আগস্ট ভোলার মনপুরায় বিস্কুটের প্রলোভন দিয়ে বাড়িতে নিয়ে ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক কিশোরের (১৪) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করার পর অভিযুক্ত কিশোরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর চার দিন আগে ২৬ আগস্ট ঢাকার সাভারে ৭ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় এক কিশোরকে (১৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫ আগস্ট রাজবাড়ীর পাংশায় ৬ বছরের এক কন্যাশিশুকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

চলতি বছরের ৬ এপ্রিল জামালপুরে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে অপর এক ছেলেশিশুর ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। জামালপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম এই আদেশ দেন। মামলাসূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ কন্যাশিশুটিকে ধর্ষণ করে নাবালক (১০) ওই শিশু। এ ঘটনায় কন্যাশিশুটির বাবা দেওয়ানগঞ্জ থানায় মামলা করলে ছেলেশিশুটিকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে আসামি গাজীপুর শিশু সংশোধনাগারে রয়েছে। একই ধরনের অপরাধে বরগুনায় ১৫ বছরের এক কিশোরকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ৭ জুলাই ধর্ষণের শিকার নাবালিকার বাবার করা মামলায় কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। গবেষণায় উঠে আসছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া যৌন অপরাধে নাবালকদের এই সম্পৃক্ততা যে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) রিপোর্টই তার প্রমাণ। যাতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এতে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, উঠছে প্রশ্ন। বিভিন্ন স্থানে কন্যাশিশু নাবালক (১৮ বছরের নিচে) ছেলেশিশুদের দ্বারাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আসকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে ৩ শিশুকে।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি চার বছরের এক মেয়েশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৩ শিশু-কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শাহরাস্তি মডেল থানা সূত্র বলছে, মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এদের গ্রেফতার করা হয়। মামলায় ১৯ বছর বয়সি ২ জন এবং ১২ বছর বয়সি ২ জনসহ চার শিশু-কিশোরকে আসামি করা হয়। নারায়ণগঞ্জ থানা সূত্রে জানা যায়, ফতুল্লায় একাধিকবার ধর্ষণে এক কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় করা মামলায় অভিযুক্ত এক কিশোরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ৪ জুলাই নেত্রকোনায় এক স্কুলশিক্ষার্থীকে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে এক কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। থানা সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রীর বাবা ধর্ষণ ও ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে থানায় মামলা করলে ওই কিশোরকে (১৬) গ্রেফতার করে পুলিশ।

মনোরোগ চিকিৎসকরা মনে করছেন, এর পেছনে আর্থসামাজিক তারতম্যই মূল কারণ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, ছেলেশিশু দ্বারাও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে-এমনটা ভয়াবহ উদ্বেগের। ধর্ষণকারী নাবালক শিশুর মধ্যে নিশ্চয় অনেকেই রয়েছে বিকারগ্রস্ত কিংবা মাদকাসক্তও। তাছাড়া সমাজ, পরিবার থেকেও অনেকে বঞ্চিত। বঞ্চিত হওয়া বাচ্চাদের মধ্যে মায়া-মমতা বা অন্য অনুভূতিগুলো কম থাকে। দৈনন্দিন টানাপোড়েনের মধ্যে থাকতে থাকতে যৌন অপরাধের প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়তে থাকে।

অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, বর্তমান সমাজে মধ্য কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে কিছু বিপথগামী কিশোর (১৮ বছরের নিচে) রয়েছে, যারা নেটদুনিয়ায় পর্ন ভিডিওতে আসক্ত। ফলে এমন অনেক পরিবারের নাবালক শিশুও এমন ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে পরিবারের অভিভাবক, সমাজের সমবেত মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এমন অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। পর্নোগ্রাফি বা যে কোনো ধরনের বিকৃত আসক্তি থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে যা যা করণীয়, তা নিশ্চিতভাবে করতে হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত কতজন কিশোর ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হয়েছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান সরকারিভাবে নেই। তবে দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সাধারণ অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় অসংখ্য মামলায় প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি বহু কিশোর বা অপ্রাপ্তবয়স্কও গ্রেফতার বা অভিযুক্ত হচ্ছে। এসব মামলায় অপরাধীদের শাস্তি যথাযথ নিশ্চিত হচ্ছে না।

ব্র্যাকের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অপরাধ সমীক্ষায় দেখা যায়, কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের একটি অংশজুড়ে থাকে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো নাবালক বা কিশোর ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার বিচার সাধারণ আদালতে হয় না। তাদের বিচার পরিচালিত হয় বিশেষায়িত শিশু আদালতে। আইন অনুযায়ী অপরাধী নাবালক হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি সীমিত মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম যুগান্তরকে বলেন, অপরাধী তো অপরাধীই। নাবালক কিংবা সাবালক-কারও কাছেই নারী ও শিশু নিরাপদ নয়। সমাজ থেকে ধর্ষণ, হত্যা এবং নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, প্রশাসনসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কিশোররাও নেটদুনিয়ায় অসুন্দরের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। অপরদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে যৌন সহিংসতা দিনদিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

Tag :

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশ, কিশোরও জড়াচ্ছে ধর্ষণে, বাড়ছে উদ্বেগ

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশ, কিশোরও জড়াচ্ছে ধর্ষণে, বাড়ছে উদ্বেগ

Update Time : 02:43:30 am, Friday, 4 September 2026

ধর্ষণকাণ্ডের মতো ঘৃণ্য অপরাধে নাবালক তথা শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু মেয়েশিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় নাবালক ছেলেদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় হওয়া মামলায় পুলিশ অনেক কিশোরকে গ্রেফতারও করেছে। এসব কিশোরের বয়স ১৩-১৪ বছর। আগস্টে ধর্ষণের শিকার ৫৪ শিশুর মধ্যে ৩৬ জনই কন্যাশিশু। এর মধ্যে ৮ শিশুকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। এসব ধর্ষণকাণ্ডে জড়িত থাকায় কয়েকজন ছেলেশিশুকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

৩০ আগস্ট ভোলার মনপুরায় বিস্কুটের প্রলোভন দিয়ে বাড়িতে নিয়ে ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক কিশোরের (১৪) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করার পর অভিযুক্ত কিশোরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর চার দিন আগে ২৬ আগস্ট ঢাকার সাভারে ৭ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় এক কিশোরকে (১৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫ আগস্ট রাজবাড়ীর পাংশায় ৬ বছরের এক কন্যাশিশুকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

চলতি বছরের ৬ এপ্রিল জামালপুরে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে অপর এক ছেলেশিশুর ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। জামালপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম এই আদেশ দেন। মামলাসূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ কন্যাশিশুটিকে ধর্ষণ করে নাবালক (১০) ওই শিশু। এ ঘটনায় কন্যাশিশুটির বাবা দেওয়ানগঞ্জ থানায় মামলা করলে ছেলেশিশুটিকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে আসামি গাজীপুর শিশু সংশোধনাগারে রয়েছে। একই ধরনের অপরাধে বরগুনায় ১৫ বছরের এক কিশোরকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ৭ জুলাই ধর্ষণের শিকার নাবালিকার বাবার করা মামলায় কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। গবেষণায় উঠে আসছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া যৌন অপরাধে নাবালকদের এই সম্পৃক্ততা যে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) রিপোর্টই তার প্রমাণ। যাতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এতে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, উঠছে প্রশ্ন। বিভিন্ন স্থানে কন্যাশিশু নাবালক (১৮ বছরের নিচে) ছেলেশিশুদের দ্বারাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আসকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে ৩ শিশুকে।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি চার বছরের এক মেয়েশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৩ শিশু-কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শাহরাস্তি মডেল থানা সূত্র বলছে, মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এদের গ্রেফতার করা হয়। মামলায় ১৯ বছর বয়সি ২ জন এবং ১২ বছর বয়সি ২ জনসহ চার শিশু-কিশোরকে আসামি করা হয়। নারায়ণগঞ্জ থানা সূত্রে জানা যায়, ফতুল্লায় একাধিকবার ধর্ষণে এক কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় করা মামলায় অভিযুক্ত এক কিশোরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ৪ জুলাই নেত্রকোনায় এক স্কুলশিক্ষার্থীকে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে এক কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। থানা সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রীর বাবা ধর্ষণ ও ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে থানায় মামলা করলে ওই কিশোরকে (১৬) গ্রেফতার করে পুলিশ।

মনোরোগ চিকিৎসকরা মনে করছেন, এর পেছনে আর্থসামাজিক তারতম্যই মূল কারণ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, ছেলেশিশু দ্বারাও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে-এমনটা ভয়াবহ উদ্বেগের। ধর্ষণকারী নাবালক শিশুর মধ্যে নিশ্চয় অনেকেই রয়েছে বিকারগ্রস্ত কিংবা মাদকাসক্তও। তাছাড়া সমাজ, পরিবার থেকেও অনেকে বঞ্চিত। বঞ্চিত হওয়া বাচ্চাদের মধ্যে মায়া-মমতা বা অন্য অনুভূতিগুলো কম থাকে। দৈনন্দিন টানাপোড়েনের মধ্যে থাকতে থাকতে যৌন অপরাধের প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়তে থাকে।

অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, বর্তমান সমাজে মধ্য কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে কিছু বিপথগামী কিশোর (১৮ বছরের নিচে) রয়েছে, যারা নেটদুনিয়ায় পর্ন ভিডিওতে আসক্ত। ফলে এমন অনেক পরিবারের নাবালক শিশুও এমন ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে পরিবারের অভিভাবক, সমাজের সমবেত মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এমন অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। পর্নোগ্রাফি বা যে কোনো ধরনের বিকৃত আসক্তি থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে যা যা করণীয়, তা নিশ্চিতভাবে করতে হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত কতজন কিশোর ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হয়েছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান সরকারিভাবে নেই। তবে দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সাধারণ অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় অসংখ্য মামলায় প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি বহু কিশোর বা অপ্রাপ্তবয়স্কও গ্রেফতার বা অভিযুক্ত হচ্ছে। এসব মামলায় অপরাধীদের শাস্তি যথাযথ নিশ্চিত হচ্ছে না।

ব্র্যাকের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অপরাধ সমীক্ষায় দেখা যায়, কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের একটি অংশজুড়ে থাকে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো নাবালক বা কিশোর ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার বিচার সাধারণ আদালতে হয় না। তাদের বিচার পরিচালিত হয় বিশেষায়িত শিশু আদালতে। আইন অনুযায়ী অপরাধী নাবালক হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি সীমিত মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম যুগান্তরকে বলেন, অপরাধী তো অপরাধীই। নাবালক কিংবা সাবালক-কারও কাছেই নারী ও শিশু নিরাপদ নয়। সমাজ থেকে ধর্ষণ, হত্যা এবং নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, প্রশাসনসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কিশোররাও নেটদুনিয়ায় অসুন্দরের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। অপরদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে যৌন সহিংসতা দিনদিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।