2:16 pm, Tuesday, 1 September 2026

পাখিদের ১৫ বছরের নিরাপদ এক ঠিকানা নাজিরপাড়া

ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই হাজারো ডানার ঝাপটানি আর কিচিরমিচির শব্দে জেগে ওঠে পুরো গ্রাম। গাছের ডালপালায় দেখা মেলে শত শত পাখির বাসা। কোনো বাসায় সদ্যফোটা ছানা খাবারের অপেক্ষায় ব্যাকুল হয়ে হাঁ করে বসে আছে। আবার কোথাও মা পাখি দূর থেকে ঠোঁটে করে খাবার এনে পরম আদরে ছানার মুখে তুলে দিচ্ছে। মাথার ওপর নীল আকাশজুড়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। গাছগাছালির সবুজ শাখায় চলে অবাধ বিচরণ।

এমন চিত্র দেখা মেলে পঞ্চগড়ের বোদা পৌরসভার নাজিরপাড়া গ্রামে। অঞ্চলটি এখন পরিণত হয়েছে পাখিদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে। স্বাচ্ছন্দ্যে, পরম যত্ন ও সুরক্ষায় নিজেদের কলোনি তৈরি করে প্রায় ১৫ বছর ধরে এ গ্রামটিতে বসবাস করছে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার পাখি।

গ্রামের অধিবাসীরা জানান, প্রতিবছর বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে হাজারো পাখি নাজিরপাড়ায় এসে আশ্রয় নেয়। তারা বড় বড় গাছের উঁচুডালে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে এবং ছানা ফুটিয়ে তোলে। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস এই নিরাপদ পরিবেশে অবস্থান করে তারা। পরে শীতের শুরুতে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার অন্যত্র পাড়ি জমায়। বছরের পর বছর ধরে এই নিয়মে চলে আসছে পাখিদের আগমন ও প্রত্যাগমন।

নাজিরপাড়া গ্রামে রয়েছে দেশীয় ও অতিথি পাখির এক মেলবন্ধন। এখানে শামুকখোল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, রাতচরা, ঘুঘুসহ হরেক রকমের পাখির বিচরণ চোখে পড়ে। বিশেষ করে সুদূর থেকে আসা শামুকখোল পাখিগুলো দেখতে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। পাখিদের এই কলকাকলি ও সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই স্থানীয় এলাকা ছাড়াও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী।

নাজিরপাড়া গ্রামের অধিবাসীরা দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এই পাখিদের সুরক্ষা দিয়ে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান আজাদ ও সপিয়ার রহমান বলেন, ‌‘পাখিরা আমাদের পরম বন্ধু। বাইরে থেকে কেউ যদি পাখি শিকার করতে আসে, তবে গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে তাদের বাধা দেই।’ তবে তারা আরও জানান, হাজার হাজার পাখির মলমূত্রে রাস্তাঘাট ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হয় এবং দুর্গন্ধ ছড়ায়। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করলে গ্রামবাসীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমতো।

স্থানীয় শিক্ষার্থী মানহা জানায়, প্রতিবছর শুধু পাখিদের দেখতেই তাদের গ্রামে অনেক সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা আসেন। বিকালে গাছে গাছে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে দারুণ লাগে, তাছাড়া এসব পাখি ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে কৃষকদের উপকারও করে।

দর্শনার্থী সাইফ আরেফিন বলেন, ‘বিকেলের নাজিরপাড়ার পরিবেশ সত্যিই অসাধারণ। শত শত পাখির কিচিরমিচির আর মুক্ত ডানা মেলে ওড়াউড়ি দেখে চোখ ও মন জুড়িয়ে যায়।’

পরিবেশকর্মী ও সাবেক অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম জানান, প্রকৃতি যে কত সুন্দর হতে পারে, তা নাজিরপাড়ায় পাখিদের মেলবন্ধন দেখলে বোঝা যায়। পাখিদের এই নিরাপদ আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে সচেতনতার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী নিধনে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, ‘নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। পাখিগুলো যেসব গাছে বাসা বাঁধে, সেগুলো না কেটে সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন জানান, সীমান্ত জনপদ পঞ্চগড়ের নাজিরপাড়া, মহারাজার দিঘি, ময়দানদিঘি ও নীলসাগরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর অতিথি পাখির আগমন ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ ও সচেতনতায় এসব পাখির নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

সংসদে মির্জা ফখরুলের জায়গায় সালাহউদ্দিন আহমদ—কী হতে যাচ্ছে?

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

পাখিদের ১৫ বছরের নিরাপদ এক ঠিকানা নাজিরপাড়া

Update Time : 07:45:05 am, Sunday, 30 August 2026

ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই হাজারো ডানার ঝাপটানি আর কিচিরমিচির শব্দে জেগে ওঠে পুরো গ্রাম। গাছের ডালপালায় দেখা মেলে শত শত পাখির বাসা। কোনো বাসায় সদ্যফোটা ছানা খাবারের অপেক্ষায় ব্যাকুল হয়ে হাঁ করে বসে আছে। আবার কোথাও মা পাখি দূর থেকে ঠোঁটে করে খাবার এনে পরম আদরে ছানার মুখে তুলে দিচ্ছে। মাথার ওপর নীল আকাশজুড়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। গাছগাছালির সবুজ শাখায় চলে অবাধ বিচরণ।

এমন চিত্র দেখা মেলে পঞ্চগড়ের বোদা পৌরসভার নাজিরপাড়া গ্রামে। অঞ্চলটি এখন পরিণত হয়েছে পাখিদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে। স্বাচ্ছন্দ্যে, পরম যত্ন ও সুরক্ষায় নিজেদের কলোনি তৈরি করে প্রায় ১৫ বছর ধরে এ গ্রামটিতে বসবাস করছে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার পাখি।

গ্রামের অধিবাসীরা জানান, প্রতিবছর বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে হাজারো পাখি নাজিরপাড়ায় এসে আশ্রয় নেয়। তারা বড় বড় গাছের উঁচুডালে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে এবং ছানা ফুটিয়ে তোলে। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস এই নিরাপদ পরিবেশে অবস্থান করে তারা। পরে শীতের শুরুতে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার অন্যত্র পাড়ি জমায়। বছরের পর বছর ধরে এই নিয়মে চলে আসছে পাখিদের আগমন ও প্রত্যাগমন।

নাজিরপাড়া গ্রামে রয়েছে দেশীয় ও অতিথি পাখির এক মেলবন্ধন। এখানে শামুকখোল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, রাতচরা, ঘুঘুসহ হরেক রকমের পাখির বিচরণ চোখে পড়ে। বিশেষ করে সুদূর থেকে আসা শামুকখোল পাখিগুলো দেখতে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। পাখিদের এই কলকাকলি ও সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই স্থানীয় এলাকা ছাড়াও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী।

নাজিরপাড়া গ্রামের অধিবাসীরা দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এই পাখিদের সুরক্ষা দিয়ে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান আজাদ ও সপিয়ার রহমান বলেন, ‌‘পাখিরা আমাদের পরম বন্ধু। বাইরে থেকে কেউ যদি পাখি শিকার করতে আসে, তবে গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে তাদের বাধা দেই।’ তবে তারা আরও জানান, হাজার হাজার পাখির মলমূত্রে রাস্তাঘাট ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হয় এবং দুর্গন্ধ ছড়ায়। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করলে গ্রামবাসীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমতো।

স্থানীয় শিক্ষার্থী মানহা জানায়, প্রতিবছর শুধু পাখিদের দেখতেই তাদের গ্রামে অনেক সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা আসেন। বিকালে গাছে গাছে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে দারুণ লাগে, তাছাড়া এসব পাখি ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে কৃষকদের উপকারও করে।

দর্শনার্থী সাইফ আরেফিন বলেন, ‘বিকেলের নাজিরপাড়ার পরিবেশ সত্যিই অসাধারণ। শত শত পাখির কিচিরমিচির আর মুক্ত ডানা মেলে ওড়াউড়ি দেখে চোখ ও মন জুড়িয়ে যায়।’

পরিবেশকর্মী ও সাবেক অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম জানান, প্রকৃতি যে কত সুন্দর হতে পারে, তা নাজিরপাড়ায় পাখিদের মেলবন্ধন দেখলে বোঝা যায়। পাখিদের এই নিরাপদ আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে সচেতনতার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী নিধনে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, ‘নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। পাখিগুলো যেসব গাছে বাসা বাঁধে, সেগুলো না কেটে সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন জানান, সীমান্ত জনপদ পঞ্চগড়ের নাজিরপাড়া, মহারাজার দিঘি, ময়দানদিঘি ও নীলসাগরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর অতিথি পাখির আগমন ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ ও সচেতনতায় এসব পাখির নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত হচ্ছে।